জানুয়ারি, ২০২৬
জনস্বাস্থ্য মোর্চার উদ্যোগে কামালগাজীর নিকটবর্তী একটি অঞ্চলে স্থানীয় মানুষের সক্রিয় সহযোগিতায় ধারাবাহিক ভাবে আয়োজিত হচ্ছে জনস্বাস্থ্য শিবির, সাথে স্বাস্থ্য সমীক্ষার কাজ। এই স্বাস্থ্য শিবিরে অংশগ্রহণ থেকে প্রচার, থাকা- খাওয়া, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের জোগান সহ সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষেরা। মাসে একটি করে মেডিকেল ক্যাম্প এবং দুই সপ্তাহ অন্তর একটি ফলোআপ ক্যাম্প, এই নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে ২০২৫ এর আগস্ট মাস থেকে ধারাবাহিক ভাবে স্বাস্থ্য শিবির এবং স্বাস্থ্য সমীক্ষার কাজ চলছে। স্বাস্থ্য শিবিরে নিয়মিত ওজন, উচ্চতা, নাড়ির গতি, SPO2, ব্লাড প্রেসার, ব্লাড সুগার ইত্যাদি মাপা হয়ে থাকে। সমীক্ষায় শুধু রোগ, রোগীর শারীরিক তথ্যের বিবরণ নয় বরং তাঁর বাসস্থান, খাদ্যাভ্যাস, পানীয় জল, নিকাশি ব্যবস্থা, অর্থাৎ জন্যস্বাস্থ্যর সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলিও যতটা সম্ভব তুলে আনার চেষ্টা করা হয়। তিলোত্তমা আন্দোলনের সময় থেকেই আমরা জনস্বাস্থ্য আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমাদের ভাবনা বারবার জানিয়ে এসেছি। জানিয়ে এসেছি ‘জনস্বাস্থ্য নজরদারি কমিটি’ গড়ে তোলার মাধ্যমে স্থানীয় স্বাস্থ্য পরিষেবা ও পরিকাঠামোর উপর জনগনের নজরদারি গড়ে তুলে কীভাবে সার্বিক একটি স্বাস্থ্য আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব। এটি সেই লক্ষ্যেই অঞ্চলভিত্তিক একটি কাজ বা বলা ভালো প্রাথমিক ধাপ। মূলত মোটাদাগে তিনটি কারণে এই অঞ্চল আমরা বেছে নিয়েছি। প্রথমত, এটি একটি শ্রমজীবী অঞ্চল, সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষেরা সরাসরি সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল। ফলত জনস্বাস্থ্য, স্বাস্থ্যের অধিকার, স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে কাজ করার সুযোগ এখানে রয়েছে। দ্বিতীয়ত, এলাকায় স্থানীয় মানুষের অধিকারের দাবিতে সংগ্রামের একটি ইতিহাস রয়েছে। তৃতীয়ত, স্থানীয় সংগঠক ও স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষদের সক্রিয় সহযোগিতা ও তাঁদের নিজেদের তাগিদ রয়েছে। এখন এই কাজকে আমরা সমবেত ও সামগ্রিক ভাবে কতদূর বিস্তৃত করতে পারবো, নিছক সমাজসেবা বা সংস্কারমূলক কাজের মধ্যেই আটকে যাবে, নাকি জনস্বাস্থ্যর অধিকারের যে রাজনীতি তাকে ধারণ করে স্বাস্থ্য আন্দোলনের অভিমুখে এগিয়ে যাবে তা অবশ্য সময়ই বলবে।
স্বাস্থ্য শিবির ও সমীক্ষার কাজের মধ্যে দিয়ে আমাদের প্রাথমিক ও অসম্পূর্ণ পর্যবেক্ষণ নিচে তুলে ধরা হলো। জনস্বাস্থ্য মোর্চার প্রত্যেক সাথীর সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া এইকাজ করা সম্ভব ছিলনা। এখানে অতি অবশ্যই বলে রাখা প্রয়োজন, এটি কখনোই পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট নয়, আর তাই এখান থেকে কোনো নির্দিষ্ট প্যাটার্ন বের করা এই মুহূর্তে অন্তত সম্ভব নয়। এছাড়া অনেক তথ্য প্রথমিকভাবে জেনে ওঠা বা রোগীর পক্ষেও জানানো সম্ভব হয়না। তাই ধারাবাহিক কাজের মধ্যে দিয়ে আরও কিছুটা সময় গেলে আমরা মোটামুটি একটি পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট তৈরি করতে সক্ষম হব। এটিকে একটি প্রাথমিক ও অসম্পূর্ণ পর্যবেক্ষণ হিসেবে দেখাই ভালো।
১) এখনো পর্যন্ত স্বাস্থ্য শিবিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যে মহিলাদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। সমীক্ষাপত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য, প্রায় ৬০% মহিলাদের অংশগ্রহণ থেকেছে স্বাস্থ্য শিবিরে এখনো পর্যন্ত।
২) অংশগ্রহনকারীদের বয়স সর্বনিম্ন ৭ বছর থেকে সর্বচ্চ ৮০ বছর। রয়েছেন স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী থেকে বিভিন্ন পেশার মানুষ।
৩) পুরুষদের মধ্যে বেশিরভাগ কারখানার শ্রমিক, রাজমিস্ত্রি, রিক্সাচালক, ফেরিওয়ালা, কাঠমিস্ত্রি, রঙের মিস্ত্রি, ঝাড়ুদার, সবজিওয়ালা, দোকানের কর্মী, গাড়ি চালক। মহিলারা ঘরের কাজের পাশাপাশি মাছ বিক্রি, আয়ার কাজ, ব্যাগের কারখানায় কাজ, রান্নার কাজ, জরির কাজ, গৃহ পরিচারিকার কাজ করে থাকেন।
৪) প্রায় ২৪% মানুষ রক্তচাপজনিত (ব্লাড প্রেসার) সমস্যায় রয়েছেন। বয়সের গড় ৫০ বছর।
৫) সুগারের সমস্যা রয়েছে ১৫% মানুষের। এর মধ্যে ৪০০ (mg/dl) এর উপর র্যান্ডম ব্লাড সুগার পাওয়া গেছে কয়েকজনের।
৬) হাতে পায়ে, বিশেষ করে মেরুদন্ড, কোমরে পিঠে ব্যথার সমস্যায় থাকা মানুষের সংখ্যাটা সর্বাধিক। প্রায় ৪৫%। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভাবে মহিলাদের সংখ্যা বেশি।
৭) এলার্জির সমস্যা রয়েছে ২৬% এর অধিক মানুষের। রঙের গন্ধ, বালি সিমেন্ট, বেগুন চিঙড়ি, ডিম, দানাশষ্য, রোদে এলার্জির সমস্যা রয়েছে।
৮) ঘুমের সমস্যা থেকে দুশ্চিন্তা রয়েছে ২২% এর অধিক মানুষের।
৯) শ্বাসকষ্ট জনিত সমস্যা রয়েছে ১২% এর অধিক মানুষের।
১০) এছাড়াও রয়েছে হার্টের সমস্যা, ব্রেইন, গ্যাস্ট্রিক সমস্যা, থাইরয়েড, ফ্যাটি লিভার, দাঁতে রক্তক্ষরন, চোখের সমস্যা, অধিকাংশ মহিলার গায়েনোকোলজিক্যাল সমস্যা এবং বিশেষ করে মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা ইত্যাদি।
১১) স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়মিত সব ওষুধ না পাওয়ার সমস্যা রয়েছে। রয়েছে টেস্ট না করাতে পারার অসুবিধা। সেক্ষেত্রে বাইরে থেকে ওষুধ কেনা ও টেস্ট করানো অর্থনৈতিক কারণে অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয়না।
১২) এলাকায় পানীয় জলের সমস্যা চোখে পড়ার মতন। যে কারণে কেনা জল ব্যবহার করেন প্রায় ৫০% মানুষ। বাকিরা কলের জল, মিশনের জল ব্যবহার করেন।
১৩) প্রায় ৫১% মানুষের কাঁচা ঘর। প্লাস্টিক টিন, কিছুজনের এসবেস্টাস। এমনকি ১ ঘরে ৫ জন পর্যন্ত পরিবারের মানুষ নিয়ে তাঁরা থাকেন। কমন বারোয়ারি বাথরুম ব্যবহার করেন। তবে ১-২ কামরার পাকাঘর, নিজস্ব বাথরুমও রয়েছে।
১৪) তামাকজাত দ্রব্য সেবন করেন প্রায় ৩৭%। নেশার মধ্যে রয়েছে বিড়ি সিগারেট, গুটখা, জর্দা পান, খৈনি, গুল ইত্যাদি। প্রত্যহ অতিরিক্ত মদ্যপানের সমস্যাও রয়েছে। তবে সেই সংখ্যাটি অনেকে গোপন করার কারণে সম্পূর্ণ আকারে নথিভুক্ত নয়।
১৫) স্বাস্থ্য শিবির ও স্বাস্থ্য সমীক্ষার কাজ করতে গিয়ে স্থানীয় তরুণ কয়েকজন সংগঠককে আমরা পেয়েছি যাঁরা নিয়মিত ক্যাম্পে থেকে এই কাজে সহযোগিতা করে চলেছেন। তাঁদের এই ভূমিকা অবশ্যই আলাদা প্রশংসার দাবি রাখে।
[প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেছেন সাথী শৌভিক মুখার্জি]