সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকার ঘোষণা করেছে যে আমাদের দেশে একটি নির্দিষ্ট বয়সের সমস্ত নাবালিকাকে HPV টিকা দেওয়া হবে। সরকারি ঘোষণায় শোনা যাচ্ছে যে জরায়ুর অগ্রভাগ বা সারভিক্স -এর ক্যান্সার রুখতে এই টিকা নাকি অত্যন্ত কার্যকরী। করোনা অতিমারীর সময় আমরা দেখেছি যে যথাযথ বিধি না মেনে অপরীক্ষিত করোনা টিকা ব্যবহার করে সরকার গণটিকাকরণ চালিয়েছিল এবং পরবর্তীকালে সেই পরীক্ষামূলক টিকার যাবতীয় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার দায় সরকার সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। আমরা এখন একথাও জেনেছি যে করোনার সময় টিকা প্রস্তুতকারক কোম্পানি ভারত বায়োটেক এবং সেরাম ইন্সটিটিউট বিস্তর টাকার নির্বাচনী বন্ড কিনেছিল, যার বিনিময়ে তারা বিধিভাঙ্গা টিকা বাজারে আনার ছাড়পত্র জোগাড় করেছিল। এমত পরিস্থিতিতে নতুন গণটিকাকরণ প্রক্রিয়া স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের মনে অনেক প্রশ্ন জাগিয়েছে।
HPV টিকার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
আমাদের আলোচনার শুরুতেই বলে রাখা দরকার যে জাতীয় ক্যান্সার রেজিস্ট্রির তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে যে গত তিরিশ বছরে ভারতে মহিলাদের মধ্যে স্তন ক্যান্সারের প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে এবং সারভিক্যাল ক্যান্সার বা জরায়ুর অগ্রভাগের ক্যান্সারের প্রবণতা ক্রমশ কমছে। অথচ বর্তমানে সারভিক্যাল ক্যান্সার নিয়ে আলোচনা শোনা যাচ্ছে সব থেকে বেশি। এই ক্যান্সার রুখতে বাজারে নিয়ে আসা হচ্ছে HPV টিকা।
২০০৬ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন পেয়ে ২০০৮ সালে প্রথম পরীক্ষামূলক ভাবে ভারতে এই টিকা ব্যবহার করা হয়। কয়েক বছরের মধ্যে তেলেঙ্গানা ও গুজরাট থেকে বেশ কয়েকটি নাবালিকার মৃত্যুর খবর আসে। বেশ কিছু শিশু অসুস্থতার কারণে হাসপাতালে ভর্তি হয়। আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবারের শিশুকন্যাদের মধ্যে এই টিকার বেশির ভাগ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালানো হয়েছিল। বিল ও মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন, GAVI (Global Alliance for Vaccines and Immunization) এবং PATH (Program for Appropriate Technology in Health) এর বিরুদ্ধে অনৈতিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালানোর অভিযোগ ওঠে। ২০১৩ সালে আমাদের সংসদে বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয় এবং তার রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়। রিপোর্টে দেখা যায় যে দুটি সরকারি সংস্থার আধিকারিকরা ( ICMR এবং DGCI এর আধিকারিক এবং বিশেষজ্ঞ ) ভারতবর্ষের মাটিতে বৈদেশিক PATH সংস্থাটিকে অনৈতিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালাতে সাহায্য করেছিল। বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে নথিপত্রে উল্লেখ ছিল যে observational study বা পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণার অনুমতি নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এই তথ্য সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়েছিল যে ট্রায়ালগুলিতে নাবালিকাদের পরীক্ষামূলক ভ্যাক্সিন দেওয়া হয়েছিল। যে ট্রায়ালের অনুমতিপত্রে ভ্যাক্সিনের উল্লেখ ছিল, সেই ট্রায়ালগুলোতেও নিয়ম ভাঙা হয়েছিল। যে নাবালিকাদের ওপর HPV টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালানো হয়েছিল তাদের অধিকাংশের পরিবারবর্গের থেকে কোন অনুমতি নেওয়া হয়নি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শিশুদের হোমের কর্তা ব্যক্তিরা Informed Consent (অবহিত অনুমতি) এর ফর্মগুলি সই করেছিলেন। শিশুদের পরিবারকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে প্রাক বয়ঃসন্ধি মেয়েদের এই টিকা দেওয়া হয়েছিল।
PATH, GAVI, বিল ও মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের সাথে হাতে হাত মিলিয়ে সরকারি আধিকারিক এবং বিশেষজ্ঞরা যে জালিয়াতি করেছিলন তার প্রমাণ এখনো রয়েছে এই রিপোর্টে (লিঙ্ক তথ্যসূত্রে দেওয়া আছে)। রিপোর্টে আরও দেখা যাচ্ছে যে কোন রকম পরীক্ষানিরীক্ষার পূর্বেই টিকাটিকে নিরাপদ ও কার্যকরী বলেছিলেন সরকারি আধিকারিক এবং বিশেষজ্ঞরা। টিকার কার্যকারীতা বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষার আগেই নাকি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলেন। আগেই বলেছি যে ট্রায়ালের অনুমতি পত্রের ক্ষেত্রে জালিয়াতি হয়েছিল বিস্তর। প্রশ্ন ওঠে PATH এর মতো বৈদেশিক সংস্থা দেশের আইন কানুনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কিভাবে আমাদের দেশে ব্যবসা ফেঁদে বসেছিল ত্রাণকর্তার ভেক ধরে। এমত অবস্থায় সংসদে সুপারিশ আসে PATH কে আমাদের দেশ থেকে বহিষ্কার করার, GAVI এবং বিল ও মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের ক্ষমতায় লাগাম পরানোর। কয়েক বছরের জন্য এই বৈদেশিক সংস্থাগুলি আংশিকভাবে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল। অবশেষে করোনা অতিমারীর সময় সংক্রামক রোগের ভয় দেখিয়ে এরা আবার সগৌরবে আমাদের দেশে ফিরে এলো পরিত্রাতার ভূমিকায়। পরীক্ষা নিরীক্ষা ছাড়াই সরকারি আধিকারিকরা আমাদের এবারেও বললেন যে 'করোনা টিকা ১১০% নিরাপদ'। করোনা টিকাকরণ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরেই তারা ব্যাগ থেকে বের করেছে আবার সেই বিক্রি না হওয়া পুরনো ভ্যাক্সিন - HPV ভ্যাক্সিন। আমাদের দেশের সরকারি ঘোষণা বলছে মূলত জরায়ুর অগ্রভাগ বা সারভিক্যাল ক্যান্সার থেকে পরবর্তী প্রজন্মকে রক্ষা করার জন্য এই টিকা দেওয়া হবে। দেশের স্কুল ও প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে সমস্ত ৯ থেকে ১৪ বছর বয়সের নাবালিকারা এই টিকা পেতে চলেছে। এযাবৎ তিনটি কোম্পানির HPV টিকা ভারতে ব্যবহারের অনুমোদন পেয়েছে। এর মধ্যে মার্ক কোম্পানির গার্ডাসিল এবং গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইন কোম্পানির সারভারিক্স ভারতে ব্যবহারের অনুমোদন পেয়েছিল ২০০৮ সালে সেই অনৈতিক ও অসম্পূর্ণ ট্রায়ালের মাধ্যমে (কারণ লাইসেন্স পাশ হয়েছিল ট্রায়ালের আগে)। খেয়াল করে দেখুন সংসদে আলোচনার পরেও এই দুটি ভ্যাক্সিনের লাইসেন্স বাতিল হয়নি! HPV টিকাকরণ বন্ধ করা এবং এই দুটি ভ্যাক্সিনের লাইসেন্স বাতিল করার আর্জি জানিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালাতে একটি জনস্বার্থ মামলার এখনো মিমাংসা হয়নি, অথচ গণটিকাকরণ কর্মসূচি গ্রহণ করা হচ্ছে। এই দুটি কোম্পানির HPV টিকা ছাড়াও সেরাম ইন্সটিটিউটের সারভ্যাভাক অনুমোদন পেয়েছে ২০২১ সালে। সেরাম ইন্সটিটিউট সেবছর প্রচুর টাকার নির্বাচনী বন্ড, প্রভৃতির মাধ্যমে দেশের শাসকদলকে বিপুল আর্থিক অনুদান দিয়েছিল। তার বিনিময়ে কোম্পানিটি করোনা ও সারভিক্যাল ক্যান্সারের টিকার ছাড়পত্র জোগাড় করে।
সারভিক্যাল ক্যান্সার বা জরায়ুর অগ্রভাগের ক্যান্সার কি?
মেয়েদের শরীরে যোনীর উপরের ভাগ বা জরায়ুর অগ্রভাগকে বলে সারভিক্স। সাধারণত ঋতুজরা বা মেনোপজের সময় বা তার পরবর্তীকালে মহিলারা এধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। অন্যান্য ক্যান্সারের মতোই, এই ধরনের ক্যান্সারের ক্ষেত্রেও কোন একটা কারনে এই ক্যান্সারে মানুষ আক্রান্ত হয় এমনটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে দেখা যাচ্ছে যে পৃথিবীতে অর্থনৈতিকভাবে অনুন্নত দেশগুলিতে সারভ্যিকাল ক্যান্সারের প্রাধান্য বেশি। ভারতের মতো দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবারের মহিলারা এই ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত হন।
আমরা আগেই বলেছি যে আমাদের দেশে সারভিক্যাল ক্যান্সারের প্রবণতা ক্রমশ কমছে। আমরা যদি গত তিরিশ বছরের হিসাব দেখি তাহলে আমাদের দেশে এখন মহিলাপিছু সন্তানের সংখ্যা আগের থেকে কমেছে। এখন প্রাথমিক চিকিৎসালয়গুলিতে সন্তান প্রসবের সুবিধা রয়েছে। বিভিন্ন স্ত্রীরোগের চিকিৎসার সুবিধা আর আগের থেকে উন্নত যৌন স্বাস্থ্যবিধির কারণেও সারভিক্যাল ক্যান্সারের হার কমেছে বলে মনে করা হয়। মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ার ফলে বহু ক্ষেত্রে এই ক্যান্সার আজকাল ধরা পড়ে যথেষ্ট তাড়াতাড়ি। দেশের বহু প্রত্যন্ত অঞ্চলে আজকাল প্যাপ স্মিয়ার পরীক্ষার সুবিধা রয়েছে। এই প্যাপ স্মিয়ার পরীক্ষার মাধ্যমে যোনী বা জরায়ুর অগ্রভাগের কোষের বিভিন্ন ধরনের অস্বাভাবিকতা সহজে ধরা পড়ে। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীর প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হয়।
মনে রাখতে হবে আমাদের দেশে কিন্তু এখনো HPV টিকা গণহারে প্রয়োগ হয়নি। অথচ সরকারি তথ্য অনুসারে সারভিক্যাল ক্যান্সারের প্রবণতা আমাদের দেশে ক্রমশ নিম্নগামী। তাহলে ভেবে দেখা দরকার কোন সঠিক পদক্ষেপের জন্য জনতার মধ্যে এই ক্যান্সারের হার কমছে। সাথে এটাও বিচার্য যে বর্তমান পরিস্থিতিতে গণহারে HPV টিকাকরণ আদৌ জরুরি কিনা।
সারভিক্যাল ক্যান্সারের সাথে হ্যুম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস বা HPV র সম্পর্ক কি?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তার ওয়েবসাইটে জানাচ্ছে যে পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ তাদের যৌন জীবনে একাধিকবার হ্যুম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসে সংক্রমিত হয়। সাধারণভাবে সুস্থ শরীরে এই ভাইরাস কোন রোগ লক্ষণ তৈরি করে না। তাই নিজেদের অজান্তে আমরা সংক্রমিত হই আবার তার থেকে কোন রোগ লক্ষণ ছাড়াই মুক্ত হয়ে যাই।
সারভিক্যাল ক্যান্সারের রোগীদের মধ্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রে HPV সংক্রমণ দেখা যায়। আমরা আগেই বলেছি যে সারভিক্যাল ক্যান্সারের রোগীরা আমাদের দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আসেন দরিদ্র পরিবার থেকে। তাদের মধ্যে নানা ধরনের অপুষ্টিজনিত সমস্যা থাকে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও দুর্বল হয়। উপযুক্ত গর্ভনিরোধক ব্যবহারে অসচেতনতা, পরিষ্কার বাথরুমের অভাব, মাসিকের সময় উপযুক্ত স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলতে না পারা, যৌন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে না পারা ইত্যাদি সমস্যায় এই মহিলারা জর্জরিত। সচেতনতার অভাব ও অর্থনৈতিক দুর্বলতার জন্য এনারা সময় মতো স্ত্রী রোগের চিকিৎসার সুযোগ পান না। তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে এইসব রোগ ধরা পড়ে অনেক দেরীতে। যোনীপথের টিউমার, পলিপ, আঁচিল বা ক্ষত প্রভৃতি বাড়তে থাকলে তা শরীরে নানা রোগ লক্ষণ তৈরি করে। দীর্ঘদিনের চিকিৎসার অভাবে এগুলি পরবর্তীকালে ক্যান্সার কোষের উৎস হয়ে দাঁড়ায়।
আমরা আগেই বলেছি, যে মহিলারা পুষ্টিকর খাদ্য, সুস্থ পরিবেশ, উপযুক্ত স্বাস্থ্য পরিষেবা পান তাঁরা সাধারণত সারভিক্যাল ক্যান্সারে আক্রান্ত হন না। কারণ HPV তাঁদের শরীরে রোগ লক্ষণ তৈরি করতে পারে না। বিভিন্ন স্ত্রীরোগের চিকিৎসার যথাযথ সুযোগ থাকলে এই ধরনের ক্যান্সার হওয়ার আগেই সাবধান হওয়া সম্ভব। ঋতুজরার সময় ও তার পরবর্তীকালে কয়েক বছর অন্তর স্বাস্থ্য কেন্দ্রে সাধারণ পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে বহু স্ত্রীরোগের সনাক্তকরণ ও চিকিৎসা সম্ভব হয়।
আসা যাক HPV সনাক্তকরণ প্রক্রিয়ার বিষয়ে। একথা ঠিক যে সারভিক্যাল ক্যান্সারের অধিকাংশ রোগীর মধ্যে HPV সংক্রমণ পাওয়া যায়। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে এই HPV সংক্রমণের পরীক্ষার জন্য ব্যবহার হয় PCR যন্ত্র। রোগ সনাক্তকরণ বা ডায়াগোন্সটিক পরীক্ষার জন্য PCR যন্ত্রের ব্যবহার নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে বিস্তর বিতর্ক রয়েছে। PCR যন্ত্র সম্পর্কে সব থেকে বড় অভিযোগ হল এই যে এতে মিথ্যা পজিটিভ এবং মিথ্যা নেগাটিভ ফলাফল দেখানোর প্রবণতা খুব বেশি। PCR যন্ত্রের ইতিহাস বা তাত্ত্বিক দিকটি নিয়ে আমরা এখানে আলোচনা করবো না। সারভিক্যাল ক্যান্সার নিয়ে কথা বলতে গেলে এটাই খেয়াল রাখা দরকার যে কারা এই ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন। তাহলেই বোঝা যাবে যে আসল সমস্যাটা হল অপুষ্টি, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সুষ্ঠু স্বাস্থ্য বিধি ও চিকিৎসা ব্যবস্থার অভাব। বর্তমানে যেভাবে HPV নামক এই বিশেষ ভাইরাসকে এই ক্যান্সারের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে তুলে আনা হচ্ছে তা পুরোপুরি অযৌক্তিক। মনে রাখতে হবে ১০% থেকে ৩০% ক্ষেত্রে সারভিক্যাল ক্যান্সারের রোগীদের মধ্যে HPV সংক্রমণ পাওয়া যায় না। তাই সম্পূর্ণ স্বাস্থ্য বিধির দিকে নজর না দিয়ে কেবল ভাইরাসকে এই ক্যান্সারের কারণ হিসেবে দায়ী করা সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক। অথচ দেশের সরকার থেকে শুরু করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞরা আমাদের অনবরত বলে চলেছেন যে HPV র বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালালেই আমরা নাকি সারভিকাল ক্যান্সার নির্মূল করতে পারবো। আর ভাইরাসের মোকাবিলা করতে বাজারে আনা হচ্ছে HPV ভ্যাক্সিন।
জরায়ুর ক্যান্সার রুখতে HPV টিকা কি আদৌ কার্যকরী?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন পেয়ে ২০০৬ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে HPV টিকা আসে। এই টিকা মূলত দেওয়া হয় নয় থেকে চৌদ্দ বছরের নাবালিকাদের। বিভিন্ন দেশে এই বয়সের সামান্য তারতম্য রয়েছে। কোন কোন দেশে এই বয়সের ছেলেদেরকেও এই টিকা দেওয়া হয়। কোন দেশেই ২৬ বছরের বেশি বয়সের ব্যক্তিদের মধ্যে এই টিকা আজ অবধি গণহারে প্রয়োগ করা হয়নি। ধরে নেওয়া হয় ২৬ বছর বয়সের মধ্যে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ যৌন মিলন বা অন্য কোন উপায়ে HPV দ্বারা সংক্রমিত হয়ে যায় নিজের অজান্তে। তাই বলা হয় পূর্ণবয়স্কদের মধ্যে এই ভাইরাসের টিকা খুব বেশি কার্যকরী নয়।
ফিরে আসা যাক সময়ের হিসাবে। ২০০৬ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে এই টিকা অনুমোদন পাওয়ার পর থেকে এখন অবধি কেটে গেছে ১৮ বছর। তার মানে ২০০৬ সাল থেকে এখন অবধি পৃথিবীর যত দেশে নাবালিকারা এই ভ্যাক্সিন নিয়েছে তারা কেউ এখনো অবধি মেনোপজের বয়সে পৌঁছয় নি। তাহলে তাদের দেহে HPV টিকার দরুণ সারভিক্যাল ক্যান্সার আদৌ প্রতিহত হবে কিনা একথা জানা নেই। তাহলে অবশ্যই প্রশ্ন ওঠে কিসের ভিত্তিতে বলা হচ্ছে যে HPV টিকা জরায়ুর অগ্রভাগের ক্যান্সার রুখতে ৯০% থেকে ১০০% কার্যকরী!
আসলে টিকার কার্যকরীতার সংজ্ঞা ২০০৬ সালের আগেই ভ্যাক্সিন কোম্পানি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আর তাদের পেটোয়া বিশেষজ্ঞ বাহিনী পাল্টে নিয়েছিল। এটাকে বলে ট্রায়ালের end point বা অবসান নির্ধারণ করা। HPV টিকা দেওয়ার নির্দিষ্ট সময় পর যদি এই ভাইরাসে সংক্রমণ বা সংক্রমণের তীব্রতা কমে বা বন্ধ হয় তাহলেই ভ্যাক্সিন কার্যকরী বলে ধরে নেওয়া হবে। অর্থাৎ যে রোগটিকে সামনে রেখে এই ভ্যাক্সিন দেওয়া হচ্ছে, রোগটি প্রতিহত হবে কিনা তা আদৌ জানা নেই। অথচ HPV সংক্রমণের মাত্রা দিয়ে বলা হচ্ছে টিকা ১০০% কার্যকরী। তাহলে বোঝা গেল যে HPV টিকার মাধ্যমে সারভিকাল ক্যান্সার প্রতিরোধ করা যায় এটা নিছক বিশ্বাস, এর পিছনে কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তাই গণহারে দেশের নাবালিকাদের ওপর HPV ভ্যাক্সিন প্রয়োগ করা সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়, অবৈজ্ঞানিক ও অনৈতিক।
অনৈতিক কারণ, আমরা ভ্যাক্সিনের ট্রায়াল ও প্রয়োগে যে যুক্তিহীনতা দেখতে পাচ্ছি তা সরকারি বিশেষজ্ঞদের নজর এড়িয়ে যেতে পারে না। তাঁরা হয় উদাসীন নাহলে দুর্নীতিগ্রস্ত। আমরা বলেছি যে তাঁদের অনেকের বিরুদ্ধে এই বিশেষ ভ্যাক্সিনটির ট্রায়ালের সময় জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছিল।
HPV টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সংক্রান্ত তথ্য
আমরা দেখলাম যে HPV টিকার ক্রিয়া (সারভিক্যাল ক্যান্সার রোধ করা) বিষয়ে যথেষ্ট পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়নি। সুতরাং এই টিকার প্রতিক্রিয়া বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে যে প্রায় কোন গবেষণাই হয় নি তা বলা বাহুল্য। শুধু আমাদের দেশে নয়, অন্যান্য অনেক দেশের বহু ট্রায়ালে দেখা গেছে যে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের দুটি ভাগে ভাঙা হয়েছে। অর্ধেক ব্যক্তি পেয়েছে HPV টিকা, বাকি অর্ধেক পেয়েছে হেপাটাইটিস টিকা। এধরনের হাঁসজারু ট্রায়ালের ফলাফল থেকে আদৌ কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব কি ? এছাড়া HPV টিকার ট্রায়ালের ক্ষেত্রে আমাদের দেশে আরেকটি চমকপ্রদ বিষয় ছিল এই যে পরীক্ষার প্রায় সমস্ত খরচ টিকা প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলি দিয়েছিল। সুতরাং টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার যথেষ্ট তথ্য না থাকা স্বাভাবিক। মেধাস্বত্ত অধিকার সংক্রান্ত নিয়ামাবলীর জন্য স্বাধীন গবেষণা হওয়াও আজকাল অত্যন্ত মুশকিল। তবে এই টিকার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে অনেকের শরীরে এই টিকার দরুণ ডিম্বাশয়ের অপূরণীয় ক্ষতি হয়।
২০১৩ সালে যখন ভারতের রাজ্যসভায় HPV টিকার বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছিল তখন জাপানেও এই টিকার বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ ওঠে। জাপানে এই টিকা সরকারি খরচে বা গণহারে অদ্যাবধি প্রয়োগ হয় না। ২০১৩ সালের পর HPV টিকা আমাদের দেশে গণহারে প্রয়োগ করা বন্ধ হয়। ২০২৪ এর বাজেটে সরকারি খরচে HPV টিকার গণটিকাকরণ কর্মসূচি ঘোষণা হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে সরকার হঠাৎ কেন তার পুরনো সিদ্ধান্ত থেকে সরে এলো?
জনস্বাস্থ্য নীতির উলট পুরাণ
যথেষ্ট পরিমাণে পুষ্টিকর খাদ্য, পরিশ্রুত পানীয় জল, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং বিনামূল্যে সকলের জন্য যুক্তিপূর্ণ চিকিৎসা পরিষেবা - এর সমাহারে একটি দেশে গঠিত হয় দৃঢ় জনস্বাস্থ্য পরিসর। খেয়াল করলে দেখা যাবে করোনা পরবর্তী সময়ে আমাদের দেশের জনস্বাস্থ্য নীতি ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। বর্তমানে বিনামূল্যে সরকারি চিকিৎসা পরিষেবার পরিবর্তে সরকার চটকদার স্বাস্থ্য বীমা প্রকল্প চালু করছে। এছাড়া ক্রমবর্ধমান ওষুধের দামের জন্য বহু মানুষ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের চিকিৎসা করাতে পারেন না। করোনা পরবর্তী সময়ে আমাদের দেশে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, ক্যান্সার ও অন্যান্য অসংক্রামক রোগ বহুগুণ বেড়েছে। অথচ জনস্বাস্থ্যের পরিধি সংকুচিত হয়ে এখন কেবল সংক্রামক রোগের টিকাকরণ জনস্বাস্থ্যের সাথে সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাস্থ্য বাজেটের অধিকাংশ অর্থ স্বাস্থ্য বীমা আর ভ্যাক্সিনে খরচ হয়। করোনা, হাম রুবেলা, ডেঙ্গু, প্রভৃতি বিভিন্ন রোগের হরেক রকম ভ্যাক্সিন জাতীয় টিকাকরণ কর্মসূচির অন্তর্গত করার প্রক্রিয়া চলছে।
আমাদের দেশের সরকারি স্কুলগুলিতে যে নাবালিকা পড়ুয়ারা প্রতিদিন যায় সেখানে অধিকাংশ জায়গায় আজকেও পরিস্রুত পানীয় জল, পরিচ্ছন্ন বাথরুম, বাথরুমে ব্যবহারের জলের ব্যবস্থা আদৌ আশানুরূপ নয়। এই নাবালিকারা অনেকেই মাসিকের সময় উপযুক্ত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার সদব্যবস্থা করে উঠতে পারে না। স্কুলের মিড ডে মিলে পড়ুয়ারা যথেষ্ট পরিমাণে প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার পায় না। আমাদের দেশের নাবালিকাদের মধ্যে রক্তাল্পতার সমস্যা আশাঙ্কাজনক মাত্রায় বেশি। একথা ঠিক যে সাধারণত নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে আসা মেয়েদের মধ্যে থেকেই কেউ কেউ মেনোপজের পরে সারভিক্যাল ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়।
- উপরের এই সমস্যাগুলি সমাধানের দিকে নজর না দিয়ে কেবল HPV টিকাকরণের মাধ্যমে সারভিক্যাল ক্যান্সার নির্মূল করার প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।
- গত তিরিশ বছরে স্ত্রী রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে সচেতনতা বৃদ্ধি ও সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবার সামান্য উন্নতির ফলে আমাদের দেশে সারভিক্যাল ক্যান্সারের প্রবণতা ক্রমশ কমছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বুনিয়াদি জনস্বাস্থ্য গড়ার লক্ষ্য থেকে সরে এসে জরায়ুর অগ্রভাগের ক্যান্সার রুখতে এই HPV টিকা করণ কর্মসূচি অপ্রয়োজনীয়।
- যেহেতু পৃথিবীতে প্রথম যে নাবালিকা HPV টিকা নিয়েছিল তার এখনো ঋতুজরা বা মেনোপজের বয়স হয় নি, তাই HPV টিকা আদৌ সারভিক্যাল ক্যান্সার প্রতিরোধ করে কিনা তা জানা নেই। সারভিক্যাল ক্যান্সার নির্মূল করার উদ্দেশ্যে দেশের নাবালিকাদের অপরীক্ষিত ভ্যাক্সিন দেওয়ার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক।
- পুরনো দুটি HPV টিকার অনুমোদন প্রক্রিয়ায় যে জালিয়াতি হয়েছিল তার প্রমাণ রয়েছে। সংসদে ও আদালতে সেইসব সাক্ষ্য প্রমাণ গ্রাহ্য হয়েছে। সেরাম ইন্সটিটিউট ক্ষমতাসীন দলকে বিপুল অনুদান দিয়ে তাদের HPV টিকার ছাড়পত্র ঘোষণা করেছে। এই কোম্পানির কোভিশিল্ড করোনা টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টে যে মামলা দায়ের হয়েছে তাতে আমরা দেখেছি যে সরকার ও কোম্পানি উভয়েই খুব সহজে সাধারন মানুষকে গিনিপিগ বানানোর দায় ঝেড়ে ফেলেছে। এতো তথ্য প্রকাশ্যে থাকা সত্ত্বেও সরকার যে সারভিক্যাল ক্যান্সারের বিরুদ্ধে গণটিকাকরণ কর্মসূচি নিতে চলেছে তা সম্পূর্ণ অনৈতিক।
সরকারের কাছে আমাদের দাবী :
ক) ২০১৩ সালে রাজ্য সভায় HPV ভ্যাক্সিনের ট্রায়াল বিষয়ে যে রিপোর্ট তৈরি হয়েছিল তা নতুন সরকারকে আবার খতিয়ে দেখতে হবে।
খ) সেরাম ইন্সটিটিউট ২০১৮ - ২০১৯ সালে তাদের সারভাভ্যাক HPV ভ্যাক্সিনের যে ট্রায়াল করেছে তার সম্পূর্ণ তথ্য প্রকাশ করতে হবে।
গ) পুরনো ট্রায়াল ও তার ভিত্তিতে পাওয়া গার্ডাসিল ও সারভারিক্সের অনুমোদন বাতিল করতে হবে।
ঘ) কার্যকারীতার প্রশ্নে সেরাম ইন্সটিটিউটের সারভ্যাভাকের ক্ষেত্রেও জানা নেই এটি আদৌ সারভিক্যাল ক্যান্সার রোধ করে কিনা। তাই সারভাভ্যাকের লাইসেন্স বাতিল করতে হবে।
সারভিক্যাল ক্যান্সার নির্মূল করার ভুয়ো উদ্দেশ্যে সরকার যে HPV গণটিকাকরণ কর্মসূচি নিতে চলেছে তা সম্পূর্ণ বাতিল করতে হবে।
ঙ) সংক্রামক রোগের ভয় দেখিয়ে হরেক রকম ভ্যাক্সিনের পিছনে সরকারি অর্থ নষ্ট করা বন্ধ করতে হবে। যথেষ্ট পরিমাণে পুষ্টিকর খাদ্য, পরিশ্রুত পানীয় জল, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং বিনামূল্যে সকলের জন্য যুক্তিপূর্ণ চিকিৎসা পরিষেবায় জোর দিতে হবে।
তথ্যসূত্র
১) https://www.thelancet.com/journals/lansea/article/PIIS2772-3682(23)00156-7/fulltext
Research paper on survival rates of cervical cancer in india
২) https://www.sciencedirect.com/science/article/pii/S1877782121000990
Trends in breast and cervical cancer in India under National Cancer Registry Programme
The Economic Times, Aug 31 2014
৫) 72nd Report On Alleged Irregularities in the conduct of Studies Using HPV Vaccine by PATH in India, Parliament of India, Rajya Sabha - https://hsrii.org/wp-content/uploads/2014/07/72.pdf
৬) https://youtu.be/faJ4LxrfDo4
Cervical Cancer Vaccine - Should We Trust The Government Narrative? - Dr Maya Valecha, Gyanecologist & Public Health Activist in conversation with People's Alliance for Public Health (PAPH)
৭) https://www.youtube.com/watch?v=OGTA_ezWqog
New Health Policies: Is Our Government Taking Correct Decisions? - Dr Amitav Banerjee, Epidemiologist and Professor of Community Medicine, in conversation with People's Alliance for Public Health (PAPH)
৮) https://www.thelancet.com/journals/lanpub/article/PIIS2468-2667(23)00180-9/fulltext
Research Paper on efficacy of HPV vaccines. Research funded by Bill & Melinda Gates Foundation
৯) https://www.who.int/news-room/fact-sheets/detail/cervical-cancer#:~:text=Persistent%20infection%20with%20high%2Drisk,causes%2095%25%20of%20cervical%20cancers.
WHO cervical cancer fact sheet
১০) https://acvip.org/parents/columns/cervical-cancer.php
Cervical Cancer & HPV Vaccines Guidelines by Advisory Committee on Vaccines & Immunization Practices
১১) https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC9866915/
Risk of Premature Ovarian Insufficiency after Human Papilloma Virus Vaccination
১২) https://www.sciencedirect.com/science/article/abs/pii/S0264410X22015638
Spontaneous reports of primary ovarian insufficiency after vaccination: A review of the vaccine adverse event reporting system (VAERS)
১৩) https://www.indiascienceandtechnology.gov.in/listingpage/hpv-vaccination-received-push-budget-2024#:~:text=All%20girls%20between%20the%20ages,in%20rolling%20out%20the%20campaign
[হালিসহর বিজ্ঞান পরিষদের মুখপত্র 'মুক্ত বিজ্ঞান চেতনা'র জুলাই ২০২৪ এবং জনস্বাস্থ্য জনবার্তা'র বইমেলা ২০২৫ সংখ্যায় পূর্বপ্রকাশিত।]