মানুষের ক্ষেত্রে ভ্রূণের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে গোনাডের কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গগত পরিচয় থাকে না; এই অবস্থাকে বাইপোটেনশিয়াল গোনাড বলা হয়। উপযুক্ত জৈবিক সংকেত পেলে এটি অণ্ডকোষ কিংবা ডিম্বাশয়, যে কোনো একটির রূপ নিতে পারে। যদি ভ্রূণের ক্রোমোজোম বিন্যাস XY হয়, তবে Y ক্রোমোজোমে অবস্থিত Sry জিন সক্রিয় হয়ে এই গোনাডকে অণ্ডকোষে পরিণত করে। পরবর্তীতে অণ্ডকোষ থেকে নিঃসৃত টেস্টোস্টেরোন পুরুষদেহের গঠন ও বৈশিষ্ট্য বিকাশে সহায়তা করে। বিপরীতে, ভ্রূণ যদি XX হয়, তবে Y ক্রোমোজোমের অনুপস্থিতিতে গোনাড ডিম্বাশয়ে পরিণত হয় এবং ইস্ট্রোজেন হরমোনের প্রভাবে নারীদেহের গঠন সম্পন্ন হয়।
বেশিরভাগ প্রাণীতে গোনাডের বিকাশ সাধারণত তিনটি ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথম ধাপে অণ্ডকোষ বা ডিম্বাশয় তৈরির প্রাথমিক আণবিক সংকেত শুরু হয়। দ্বিতীয় ধাপে এই দুই সম্ভাব্য পথের একটি স্থায়ীভাবে সক্রিয় হয় এবং অন্যটিকে দমন করা হয়। শেষ ধাপে গোনাড সম্পূর্ণ কার্যকর অঙ্গ হিসেবে বিকশিত হয়।
অনেক উভলিঙ্গ মাছের দেহে একসঙ্গে দুটি গোনাড উপস্থিত থাকে, যার মধ্যে সাধারণত একটি কার্যকর এবং অন্যটি নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকে। যখন প্রাকৃতিক লিঙ্গ পরিবর্তন ঘটে, তখন সক্রিয় গোনাডটি ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং সুপ্ত গোনাডটি কার্যকর হয়ে ওঠে। আবার কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে দ্বিমুখী লিঙ্গ পরিবর্তনের ক্ষমতা থাকে। এদের মধ্যে একটি গোনাড কেবল নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়, ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় না, ফলে প্রয়োজন অনুসারে বারবার লিঙ্গ পরিবর্তন সম্ভব হয়।
মিয়োসিস বিভাজনের সময় যদি ক্রোমোজোম সঠিকভাবে পৃথক না হয়, তবে কোনো কোনো গ্যামেটে অতিরিক্ত সেক্স ক্রোমোজোম থাকতে পারে, আবার কোনো গ্যামেট কোষ সম্পূর্ণভাবে সেক্স ক্রোমোজোমবিহীনও হতে পারে। এই ধরনের গ্যামেট যখন একে অপরের সঙ্গে বা স্বাভাবিক X বা Y বহনকারী গ্যামেটের সঙ্গে মিলিত হয়, তখন মানুষের মধ্যে XO বা XXY-এর মত ভিন্ন জিনগত বিন্যাস সৃষ্টি হতে পারে। XO অবস্থা সাধারণত টার্নার সিনড্রোম নামে পরিচিত, যেখানে ব্যক্তি জন্মগতভাবে নারী হলেও শারীরিক গঠনে কিছু স্বাতন্ত্র্য দেখা যায়। অন্যদিকে XXY অবস্থাকে ক্লাইনফেল্টার সিনড্রোম বলা হয়, যেখানে ব্যক্তি জন্মগতভাবে পুরুষ বা ইন্টারসেক্স হতে পারেন এবং বয়ঃসন্ধিকালীন বিকাশ অনেক সময় বিলম্বিত হয়। ‘ইন্টারসেক্স’ বলতে এমন ব্যক্তিদের বোঝানো হয়, যাদের বাহ্যিক যৌনাঙ্গ দেখে জন্মের সময় স্পষ্টভাবে নারী বা পুরুষ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। যদিও XO বা XXY ব্যক্তিদের ইন্টারসেক্স হিসেবে গণ্য করা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
মানুষের ক্ষেত্রে ভ্রূণ অবস্থায় প্রাইমোর্ডিয়াল জার্ম কোষ শরীরের এক স্থানে উৎপন্ন হয়, আর গোনাড তৈরি হয় অন্য স্থানে। পরবর্তী সময়ে এই জার্ম কোষগুলো গোনাডে অভিবাসন করে এবং সেখানে পৌঁছে টেস্টোস্টেরোন বা ইস্ট্রোজেনের প্রভাবে যথাক্রমে স্পার্মাটোগোনিয়া বা ঊগোনিয়াতে রূপান্তরিত হয়।
গোনাড থেকে নিঃসৃত সেক্স হরমোন শুধু শরীর নয়, মস্তিষ্কের লিঙ্গগত গঠন ও কার্যপ্রণালীতেও প্রভাব ফেলে। সহজভাবে বলা যায়, মস্তিষ্কের এই লিঙ্গগত বিন্যাসই পরবর্তীতে একজন মানুষের জেন্ডার পরিচয়ের ভিত্তি গড়ে তোলে।
যৌন আচরণ সবসময় সরাসরি প্রজননে অবদান না রাখলেও প্রকৃতিতে তা টিকে রয়েছে, এর কারণ অনুসন্ধান করা স্বাভাবিক। মৌমাছির ক্ষেত্রে দেখা যায়, রানী ছাড়া অন্য সব নারী মৌমাছি প্রজননে অংশ না নিয়ে শ্রমিক হিসেবে মৌচাকের সুরক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে। নিজেদের মধ্যেকার জেনেটিক বিন্যাসগত আত্মীয়তাই শ্রমিক মৌমাছিদের নিঃস্বার্থ আচরণের বিবর্তনীয় ভিত্তি। একইভাবে মানবসমাজে সমকামী ব্যক্তিরা সরাসরি প্রজননে অংশ না নিলেও অনাথ শিশু দত্তক নেওয়ার মাধ্যমে নিজ প্রজাতির টিকে থাকার প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারেন। এসব উদাহরণ যৌন আচরণকে কেবল প্রজননের সঙ্গে সম্পর্কিত না করে যৌনতা লব্ধ আনন্দের দিককেও স্বীকৃতি দেয়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, লিঙ্গ নির্ধারণ প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল ও বহুমাত্রিক। এই প্রক্রিয়ার যে কোনো স্তরে পরিবর্তন বা ভিন্ন প্রভাব সেক্স ও জেন্ডারের মধ্যে, অর্থাৎ শারীরিক ও মানসিক লিঙ্গের মধ্যে, অমিল সৃষ্টি করতে পারে, যার ফল হিসেবে ট্রান্সজেন্ডার আত্মপরিচয়ের উদ্ভব ঘটে। এটি কোনো মানসিক ব্যাধি নয় বরং একটি স্বাভাবিক জৈবিক বৈচিত্র্য, যার উদাহরণ প্রাণিজগতে বিস্তর পাওয়া যায়।
কিছু ব্যক্তি একই সঙ্গে সমকামী এবং আচরণগতভাবে বিপরীত জেন্ডারের প্রকাশ ঘটান, যার ফলে তারা সমাজে বেশি দৃশ্যমান হন এবং প্রায়শই বিদ্রূপ বা বৈষম্যের শিকার হন। এই শ্রেণির কারও মধ্যে কৃত্রিম লিঙ্গ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাও দেখা যেতে পারে। আবার সমকামী হওয়া মানেই যে নিজের জন্মগত লিঙ্গ নিয়ে অস্বস্তি থাকবে, এমনটা নয়। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের চারিত্রিকভাবে পৃথক সেক্স ও জেন্ডারের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব থাকে না। তাই রামধনু সম্প্রদায় অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় - এর মধ্যে সমকামী, উভকামী, ট্রান্সজেন্ডার, ইন্টারসেক্স, নিষ্কামসহ নানা পরিচয়ের মানুষ অন্তর্ভুক্ত।
[জনস্বাস্থ্য মোর্চার মুখপত্র 'জনস্বাস্থ্য জনবার্তা' পত্রিকার বইমেলা ২০২৬ সংখ্যায় প্রবন্ধটি পূর্বপ্রকাশিত।
লেখক সেন্টার ফর সোশ্যাল আক্টিভিজম ও জনস্বাস্থ্য মোর্চার সদস্য এবং জীববিদ্যার গবেষক ও অধ্যাপক ]