Select your language

অক্টোবর, ২০২৫ 

ভূপ্রকৃতি বা আবহাওয়ার বিচারে লাদাখ আমাদের রাজ্য পশ্চিম বাংলার একদম বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে। আমরা সমতলের বাসিন্দা, গ্রীষ্মমন্ডলীয় জলবায়ুতে আমরা আজীবন অভ্যস্থ। আমাদের রাজ্যের পরিবেশের সংকটের সঙ্গে লাদাখের পরিবেশের সংকটের কোন যোগাযোগ বা মিল আছে কি?

২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে আমরা জনস্বাস্থ্য মোর্চার তিনজন সদস্য লাদাখ ভ্রমণের সময় এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছি। এই প্রশ্নটির অবশ্য একটা চালু উত্তর রয়েছে। লাদাখ থেকে পশ্চিমবাংলা থেকে হনলুলু যে কোন স্থানে পরিবেশের মূল সংকটকে আজকাল এক কথায় অ্যানথ্রোপজেনিক ক্লাইমেট চেঞ্জ বা মনুষ্যকৃত জলবায়ু পরিবর্তন বলে দেওয়া হচ্ছে। আর মনুষ্যকৃত জলবায়ু পরিবর্তনের একমাত্র ভিলেন হল কার্বন ডাই অক্সাইড এবং অন্যান্য গ্রীনহাউস গ্যাস।

পরিবেশের সংকটের মতো এক জটিল বিষয়কে অতি সরলীকরণ করে দেখার প্রবণতা এই উত্তরে স্পষ্ট। আশা করি মানালি শহরের উদাহরণ দিলে আমাদের বক্তব্য বোঝাতে পারবো। হিমাচল প্রদেশে বিয়াস নদীর তীরে বহু প্রাচীন মানালি গ্রাম ব্রিটিশ যুগে শহর হিসেবে গড়ে উঠতে শুরু করে। ইদানিং প্রতি বছর বর্ষায় আমরা মানালি শহরে ভীষণ বন্যার খবর পাই, ফেসবুকে বন্যার ভয়াবহ সব ভিডিও ভাইরাল হয়। হিমালয়ে বিধ্বংসী বন্যার প্রধান কারণ আমাদের বলা হয় ক্লাইমেট চেঞ্জের জন্য গিরিশিখরের বরফ গলে গ্লেসিয়ার লেক ছাপিয়ে ওঠা।

২০১৫ সাল থেকে ওই অঞ্চলে ঘোরার অভিজ্ঞতা ও মানালি শহরের মিউজিয়ামগুলিতে রাখা শহরের পুরনো ছবি দেখে আমরা বুঝেছি মানালি শহর বাড়তে বাড়তে অর্ধেক বিয়াস নদীর ওপর চলে গেছে। অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে নদীখাত মানালির আশেপাশে এতো সঙ্কীর্ণ হয়ে গেছে যে বর্ষার ভারি বৃষ্টিতে নদীর জল পাড় ছাপিয়ে শহরের মধ্যে ঢুকে পড়ে। আসলে মানালি শহরটাই তো ঢুকে বসে আছে বিয়াস নদীর ভিতরে। শুধু মানালিতেই নয়, ওই অঞ্চলে কুলু বা অন্যান্য শহরগুলির একই চিত্র (চিত্র ১)। বিয়াস নদী ধরে পাহাড়ের পাদদেশের কাছাকাছি নেমে আসলে আমরা দেখতে পাই বেশ কয়েকটি ছোট ও মাঝারি আকারের নদীবাঁধ। নদীর খাত বাঁধ দিয়ে রুদ্ধ করার ফলেও মানালিসহ আশেপাশের অঞ্চল বর্ষাকালে নিয়মিত প্লাবিত হয়। নদীবাঁধের এই সমস্যার কথা জানা থাকলেও জলবিদ্যুৎ এখন পরিবেশ বান্ধব সবুজ শক্তি। তাই জলবায়ু পরিবর্তন রুখতে নতুন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও বাঁধ নির্মাণে সরকার উৎসাহী। কিন্তু রোটাং পাসে পনেরো বছরের পুরনো গাড়ির যাতায়াতের ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে মানালির বন্যা থেকে বাঁচা যাবে কি? (গত দশ বছর ধরে রোটাং পাসে এই নিয়ম লাগু আছে।)

                   ladakh image 1

বন্যাবিধ্বস্ত মানালি শহরের ওপর দিয়ে এই কথাগুলো ভাবতে ভাবতে আমরা পৌঁছই লাদাখে। লাদাখে তখনও কারফিউ পরিস্থিতি। ইন্টারনেট বন্ধ, দোকান পাঠ খুলছে সীমিত সময়ের জন্য।

এখানে উল্লেখ করে রাখা দরকার আমরা ২০১৫ সালের আগস্ট মাসে যখন লাদাখ গিয়েছিলাম তখন সিন্ধু নদীতে বন্যা হওয়ায় আমরা নুব্রা উপত্যকার দিকে যেতে পারি নি। ২০২৫ সালের বর্ষাকালে লাদাখে স্বাভাবিকের তুলনায় ৩৪২% অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হয়েছে। ২০২৫ সালের সবচেয়ে আর্দ্র মাস সেপ্টেম্বর মাসে লদাখে ৯৩০ শতাংশ অতিরিক্ত বৃষ্টির রেকর্ড হয়েছে। লদাখের মতো উচ্চ শীতল  মরুভূমি অঞ্চলে এর আগে বর্ষাকাল কখনো দেখা যায়নি। লাদাখের গ্রামগুলিতে ও শহরাঞ্চলে এখনও বহু মানুষ পুরনো স্থানীয় পদ্ধতিতে তৈরি বাড়িতে বাস করে। লাদাখের ঠাণ্ডায় বাড়িগুলি যেমন মোটা দেওয়াল ও গঠন পদ্ধতির জন্য উত্তাপ ধরে রাখতে পারে, তেমন দিনের বেলা সূর্যের আলো ও উত্তাপ বাড়ির ভেতরে প্রচুর পরিমানে যাতে পৌঁছয় তার যথাযথ ব্যবস্থা থাকে। লাদাখের ঠাণ্ডায় কংক্রিটের বাড়িতে থাকলে রুম হিটারের বা কাঠের খরচা হয় বিস্তর। তাই লাদাখিরা এখনও পুরনো কায়দায় তৈরি বাড়িতে থাকতে পছন্দ করে। কিন্তু ইদানিং প্রতি বছর অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হচ্ছে। পুরনো বাড়িগুলির গঠন পদ্ধতি শীতল মরুভূমির জন্য তৈরি হয়েছিল। ভারি বর্ষায় সকলেই প্রবল সমস্যায় পড়ছে। টিনের ছাদ বা কংক্রিটের বাড়ির চাহিদা বাড়ছে।

স্থানীয় জলবায়ুর সঙ্গে মানুষের জীবন জড়িয়ে থাকে। লাদাখ মরুভূমিতে গত দশ বছর ধরে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণ হিসেবে আমরা শুনছি সেই ক্লাইমেট চেঞ্জের থিওরি। আমরা এই প্রতিবেদনে নিজেদের অভিজ্ঞতা জানাচ্ছি।

ভূমি

ভূতাত্ত্বিক ভাবে লাদাখ হল তিব্বত মালভূমির অংশ। হিমাচল প্রদেশ ও কাশ্মীরের উচ্চ পর্বতমালার বৃষ্টিচ্ছায়া অঞ্চল হল লাদাখ। লাদাখের মাটিতে, পাহাড়ের গায়ে বহু rare earth mineral পাওয়া যায়। লাদাখের অনুর্বর জমিতে বহু যুগ ধরে মানুষ চাষযোগ্য কৃষিজমি প্রস্তুত করে গম, বাজরা, জব প্রভৃতি দানাশস্য উৎপাদন করে। গ্রিন হাউস তৈরি করে সব্জি চাষ হয়। শীতকালে বৃষ্টির জল বরফ আকারে জমিয়ে রেখে তাকে গ্রীষ্মকালে কৃষিকাজে ব্যবহার করার চিরাচরিত পদ্ধতি হালে আইস স্তূপ নামে বিখ্যাত হয়েছে। কিন্তু আমরা দেখেছি গত দশ বছরে লাদাখে পর্যটকের ঢল ক্রমশ বেড়েছে। পর্যটন শিল্পের জন্য চাষের জমি, নুব্রার সাদা বালির মরুভূমি বা হানলের বিস্তীর্ণ পশু চারণ ভূমি যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে হোটেল তৈরি করতে। পর্যটন শিল্পের জন্য এবং বৃষ্টিপাতের প্যাটার্ন পরিবর্তনের কারণে কংক্রিটের বাড়ি তৈরি হচ্ছে চতুর্দিকে। সাবেকি বাড়ির ড্রাই টয়লেটের বদলে কংক্রিটের বাড়িতে বসছে কমোড বসানো বাথরুম, কলের জলের ব্যবস্থা। মরুভূমির স্বল্প জলের উৎসগুলির ওপর চাপ বাড়ছে। এখানে বলে রাখা দরকার যে লাদাখে কোথাও পাইপের মাধ্যমে গরম জল সরবরাহ করার বন্দোবস্ত নেই (যা সাধারণত প্রথম বিশ্বের যে কোন শীতপ্রধান অঞ্চলে থাকে)। লাদাখের শীতকালে দিনের বেলাতেও কম করে -১০oC তাপমাত্রা থাকে। কমোড, প্যান বা কলের জল কিছুই ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। শীতকালে সাবেকি বাড়ি আর সাবেকি ড্রাই টয়লেট ছাড়া লাদাখে দিন গুজরান অসম্ভব (চিত্র ২)। বেশির ভাগ কংক্রিটের বাড়ি আর হোটেল বছরে ছয় মাস ধরে বন্ধ থাকে। অথচ প্রতি বছর আরও বেশি বেশি নতুন কংক্রিটের বাড়ি তৈরি হচ্ছে। স্থানীয় পাহাড় কেটে পাথর আর সিমেন্ট তৈরি হচ্ছে। আমাদের মনে পড়ে যাচ্ছিল কিরকম কলকাতা আর শহরতলিতে জলাজমি, পুকুর ভরাট করে একের পর এক বহুতল গজিয়ে উঠছে। নব্য নির্মিত বহুতলগুলির অধিকাংশ ফ্ল্যাট ফাঁকা পড়ে থাকে। কিন্তু নতুন বহুতল নির্মাণ থামছে না। আসলে কি লাদাখ, কি পশ্চিম বাংলা - কোথাও সরকারি বা বেসরকারি চাকরি জুটছে না। কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা করতে অপারগ সরকার খোলা জমি ছেড়ে দিয়েছে ইট বালি সিমেন্ট সিন্ডিকেটকে।

             ladakh image 2

তার উপর লাদাখে জঙ্গল নেই, কৃষি জমির পরিমাণ সামান্য। তাই সরকারি হিসেবে লাদাখের সিংহ ভাগ অঞ্চল হল বন্ধ্যা জমি বা waste land। তাই সবুজ শক্তির উদ্যোগে সে জমি কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেওয়া যায় অনায়াসে। ৩৭০ ধারা বিলোপের সঙ্গে সঙ্গে লাদাখে পাং ও সার্চুর কাছে ৪৮০০০ একর যাযাবর প্রজাতির পশুচারণ ভূমি আদানি গোষ্ঠীকে হস্তান্তরিত করা হয়েছে একটি সবুজ শক্তি পার্ক বানানোর জন্য। পর্যটন শিল্পের জন্য লাদাখের বাড়তি বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে এই কার্বন-ফ্রি উদ্যোগ। সোলার প্যানেল বসানোর কাজ যেখানে শুরু হয়েছে সেই জায়গায় আমরা গিয়েছিলাম। বলা হচ্ছে বিরাট অঞ্চল জুড়ে যেখানে সোলার প্যানেল বসবে সেখানে প্যানেলগুলির নিচে পশমিনা ভেড়ারা যাতে আগের মতোই স্বচ্ছন্দে বিচরণ করতে আর খেতে পারে তাই সুইজারল্যান্ড থেকে ঘাস এনে সেখানে বসানো হবে। সুইস ঘাস নাকি প্যানেলের ছায়াতে বাড়তে পারে। কিন্তু সুইজারল্যান্ডের ঘাস খেয়ে পশমিনা ভেড়ার বদহজম হবে কিনা বা লোমের কোন তারতম্য হবে কিনা তার কোন হিসাব আদানি করেছে বলে শুনি নি। যেমন মরুভূমির ঝোপঝাড় আর ঘাসের বদলে সুইজারল্যান্ডের ঘাসের জন্য কত জল প্রয়োজন তাও জানানো হয় নি। হাজার হাজার বছর ধরে ওই জমি যাযাবর গোষ্ঠীগুলি তাদের জীবন ও জীবিকা পালনের জন্য ব্যবহার করে। জমির মালিকানার কোন কাগজ তাদের নেই। তাই লাদাখের সব থেকে প্রান্তিক শ্রেণির জমি সর্বাগ্রে কর্পোরেটের হাতে তুলে দেওয়া হল। (চিত্র ৩) 

 ladakh image3          

জল

সবুজ শক্তির আরেকটি উৎস গ্রীন হাইড্রোজেন। লেহ বাস গুমটিতে আমরা প্রতিদিন ২ - ১০ টা হাইড্রোজেন চালিত বাস দেখেছি। তথ্যানুসন্ধান করে আমরা জানতে পারি প্যাঙ্গং হ্রদের লবণাক্ত জল ইলেক্ট্রোলিসিস বা তড়িৎ বিশ্লেষণ করে প্রতিদিন এক টন হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপন্ন করা হচ্ছে। ক্রমশ অন্যান্য জ্বালানির বদলে লাদাখের গণপরিবহন ব্যবস্থায় কেবল হাইড্রোজেন বাস ব্যবহার হবে। এক কেজি হাইড্রোজেন গ্যাস তৈরি করতে এক লিটার পরিশোধিত জল ও দুই লিটার কাঁচা (অপরিশোধিত) জল লাগে। আমাদের সন্দেহ পরিবেশের ওপর এই প্রজেক্টের প্রভাব নিয়ে যে আদৌ কোন চিন্তাভাবনা করা হয় নি। পাঙ্গং, সোকার, সমরিরির মতো লাদাখের লবণহ্রদগুলি ভূতাত্ত্বিক বিস্ময়। প্রচুর পরিযায়ী পাখি ও স্থানীয় অন্যান্য জীবজন্তু নিয়ে অত্যন্ত বিরল এক বাস্তুতন্ত্র এই অঞ্চলে রয়েছে।

পর্যটন শিল্পের চাপে লাদাখে জলস্তর থেকে প্রচুর পরিমানে জল উঠিয়ে নেওয়া হচ্ছে। নদীগুলির দূষণ বাড়ছে। এখন ভারত যদি সিন্ধু জল চুক্তি অস্বীকার করে নতুন নদী বাঁধ তৈরি করে তাহলে নদীগুলির নাব্যতা আরও হ্রাস পাবে।

লাদাখে জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি ব্যবহার

ভারতীয় উপমহাদেশে দক্ষিণ-পশ্চিমি মৌসুমী বায়ু যে বৃষ্টিপাত ঘটায় দেখা যাচ্ছে গত দশ বছরে তার কিছু প্যাটার্ন পরিবর্তন হয়েছে। চেরাপুঞ্জি ও তার সংলগ্ন অঞ্চল সর্বাধিক বৃষ্টিপাতের জন্য খ্যাত ছিল। এখান চেরাপুঞ্জিতে আগের থেকে অনেকটা কম বৃষ্টি হয়। রাজস্থান এবং সোলারপুরের মতো শুষ্ক জায়গায় বৃষ্টি বেড়েছে। আবার লাদাখে আমরা দেখছি যে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ অনেক গুণ বেড়েছে। লাদাখে গত কয়েক বছরে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য আমরা কি (কার্বন ডাই অক্সাইড ও অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাসের অতিরিক্ত নিঃসরণ জনিত) মনুষ্য সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনকে  দায়ী করবো নাকি ' মনুষ্যসৃষ্ট ' জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তির এক্ষেত্রে কোন ভূমিকা রয়েছে? 

একটা সময় ছিল যখন কবি রোম্যান্টিক হয়ে বলেছেন :

"চেরাপুঞ্জির থেকে

এক খানি মেঘ ধার দিতে পারো

গোবি সাহারার বুকে"

আজকে সেই প্রযুক্তি বিশ্বে তো বটেই, ভারতবর্ষেও নিয়মিত প্রয়োগ হচ্ছে। সরকারি তথ্য বলছে যে বিগত দশ বছর ধরে দক্ষিণ ভারতে পশ্চিমঘাট পর্বতমালার বৃষ্টিচ্ছায়া অঞ্চলে প্রতি বছর সরকার কৃত্রিম বৃষ্টিপাতের জন্য ক্লাউড সিডিং প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে। এর ফলে ১৮% অবধি অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ঘটানো সম্ভব হয়েছে। সম্প্রতি রাজস্থানে ও দিল্লিতে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের নথি রয়েছে। ভারতে ১৯৫০এর দশক থেকে এই প্রযুক্তি বিভিন্ন সময়ে ব্যবহার হয়েছে কলকাতা সহ অন্যত্র। 

আমরা কলকাতা ও শহরতলীতে ২০২৫ সালের বর্ষাকালে নিয়মিত চোখ রেখেছিলাম। আমরা দেখি যে কলকাতার আকাশে বর্ষাকালে নিয়মিত সাদা 'ধোঁয়া'র লাইন তৈরি করে একাধিক প্লেন আকাশে উড়ছে। কয়েক ঘণ্টা ধরে প্লেন উড়তে থেকেছে এবং তারপর ক্রমশ আকাশে মেঘ তৈরি হতে দেখেছি। কখনো আকাশের মেঘে কিছুক্ষণ পরে প্লেন হারিয়ে গেছে। সরকারি নথি বলছে যে আমাদের দেশে ক্লাউড সিডিং এর জন্য মূলত ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড ও সিলভার আয়োডাইড ব্যবহার করা হয়। দুটি লবণের রঙ সাদা। ফ্লেয়ার বা ছোট বিস্ফোরণের মাধ্যমে এই লবণের দ্রবণ প্লেন থেকে আকাশে স্প্রে করা হয়। ফ্লেয়ারে যে জলীয় বাষ্প থাকে তা উচ্চতায় বরফের কুচিতে পরিণত হয়ে সাদা লাইন তৈরি করে। আমরা কলকাতার আকাশে যে প্লেন ও সাদা লাইনের ছবি তুলেছি তাতে দেখা যাচ্ছে একাধিক  সাদা লাইন অল্প সময়ের মধ্যে আকাশে তৈরি হচ্ছে (চিত্র ৪)। 

ladakh image 4

কলকাতায় এই বছর বর্ষাকালে যে দিনগুলোতে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তার প্রত্যেকটি দিনে খুব অল্প সময়ের মধ্যে প্রচুর জল আকাশ থেকে ঝরে পড়েছে। তিন দিন ধরে লাগাতার ঘ্যানঘেনে বৃষ্টি হয়ে শহরে জল জমে যাওয়ার অভিজ্ঞতা এই বছর বিশেষ হয় নি। একটি বিশেষ দিনে দখিন কলকাতার একটি অঞ্চলে বেশ কিছুক্ষণ সময় অন্তর আকাশের ছবি চিত্র ৫-এ দেওয়া হল। আমাদের সন্দেহ কলকাতা ও শহরতলীতে প্রতি বছর ক্লাউড সিডিং প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে। কলকাতায় ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসের আকাশেও আমরা এরকম প্লেনের ছবি তুলেছি। প্লেন থেকে কৃত্রিম বৃষ্টিপাত প্রযুক্তি প্রয়োগের ফলে মেঘের যে পরিবর্তন হয় তার ছবি (চিত্র ৬) আমাদের তোলা ছবির সঙ্গে তুলনা করলে আমাদের এই সন্দেহর কারণ বোঝা যাবে। 

ladakh image 5

 

ladakh image 6

১লা অক্টোবরে মানালি থেকে লাদাখে প্রবেশ করার সময় বারালাচালা গিরিপথের কাছে আমরা ঝকঝকে নীল আকাশে একই রকম সাদা লাইন ও প্লেন দেখতে পাই (চিত্র ৭)। পরবর্তী এক সপ্তাহ লেহ ও নুব্রা উপত্যকায় বেশ কয়েকবার একই রকম অভিজ্ঞতা হয় আর আমরা তার ছবি তুলি। পরবর্তী দশ দিন লাদাখে আমরা নীল আকাশ পাই। অদ্ভুত ব্যাপার হল যে দিনগুলোতে নীল আকাশ ছিল সেদিন আমরা সাদা ধোঁয়া ছেড়ে কোন প্লেন উড়তে দেখি নি। এই দশ দিনের মধ্যে যে দিনগুলো আমরা লেহ শহরে কাটিয়েছিলাম তার মধ্যে প্রায় সব দিন আমরা লেহ বিমান বন্দর থেকে প্লেন উড়তে বা নামতে দেখি। কিন্তু এই দিনগুলোতে আকাশে কোন সাদা লাইন আমাদের চোখে পড়ে নি।  এটা সব থেকে বড় কারণ যে জন্য আমরা মনে করছি যে অন্য দিনগুলোতে যখন আকাশে আমরা সাদা লাইন দেখি তখন সেই প্লেনগুলি ক্লাউড সিডিং এর জন্য ব্যবহৃত হচ্ছিল।

ladakh image 7

আবার ২২শে অক্টোবর সকাল থেকে নীল আকাশে অল্প তুলোর মতো মেঘ দেখতে পাই। তার কিছুক্ষণ পর থেকে ক্রমশ আকাশ ভরে যায় সাদা ধোঁয়ার লাইনে। বেলা তিনটের মধ্যে পুরো আকাশ ধোঁয়াটে হয়ে যায়। সূর্যের আলো দেখা যায় না। (চিত্র ৮) 

ladakh image 8

লাদাখের মতো মরুভূমিতে কৃত্রিম বৃষ্টিপাত করানোর কি যুক্তি হতে পারে তা আমরা অনেক ভেবেছি। রাজস্থানে যেমন সয়াবিন ক্ষেতে কৃষিকাজের জন্য প্রাইভেট কোম্পানিকে বৃষ্টির বরাত দিয়েছিল আরেকটি প্রাইভেট কোম্পানি। লাদাখে চাষের জন্য এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা তা আমাদের জানা নেই। কিন্তু কৃষিকাজে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের বিপদ কি হতে পারে? এই প্রযুক্তি কি অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত বা বন্যা ডেকে আনতে পারে? লাদাখে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করলে আশেপাশের অন্যান্য অঞ্চলে কি বৃষ্টিপাত বা তুষারপাতের পরিমানে হেরফের হতে পারে?

বর্ষার পরে বা শীতকালে লাদাখে বা কলকাতায় যখন ক্লাউড সিডিং প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে সেটা কি উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে? সূর্য রশ্মি প্রতিফলন প্রক্রিয়ায় বিশ্ব উষ্ণায়ন কমানোর উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে কিনা এটা সরকারের কাছে আমাদের জিজ্ঞাস্য। কারণ আন্তর্জাতিক dimming the sun প্রজেক্টের সঙ্গে সরকারি গবেষণা কেন্দ্র IISc যুক্ত। জলবায়ু পরিবর্তন রুখে দেওয়ার এই প্রচেষ্টার কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি থাকতে পারে কিনা তা সকলকে ভেবে দেখতে অনুরোধ করবো। (চিত্র ৯) 

ladakh image 9

 পাশাপশি এই প্রশ্নও খুব গুরুত্বপূর্ণ যে সরকার যদি লাদাখের মতো মরুভূমি অঞ্চলে চাষের সুবিধার জন্য এরকম প্রকল্প নিয়ে থাকে তাহলে তা জনগণকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে কেন করা হচ্ছে? 

গাছপালা ও প্রাণী

লাদাখ অতি উচ্চতায় অবস্থিত একটি শীতল মরুভূমি। এবছর লেহ শহরে মশার উৎপাত দেখে আমরা খুব অবাক হই। লেহ শহরে দূষণ যেমন বাড়ছে, তেমন লাদাখে বৃষ্টিপাতের পরিমানে প্রচুর তারতম্য দেখা যাচ্ছে। যদিও গড় তাপমাত্রার সেরকম পরিবর্তন গত দশ বছরে লাদাখে দেখা যাচ্ছে না। গত দশ বছরে লেহ শহরের আশেপাশে গাছের সংখ্যা প্রচুর বেড়েছে। গাছ বাড়লে বাতাসে আর্দ্রতা বাড়ে। তার জন্য আবহাওয়ার পরিবর্তন হয়। শহরাঞ্চলে নির্মাণ কাজের জন্য প্রচুর বিদেশি পপলার গাছ লাগানো হয়েছে। এগুলি দেখতে খুবই সুন্দর। লাদাখের শুষ্ক প্রান্তরকে বাসযোগ্য সবুজ জমিতে রূপান্তরিত করে এই গাছগুলি। কিন্তু স্থানীয় জলস্তরের ওপর এগুলির কি প্রভাব আমাদের জানা নেই।

আরেকটি লক্ষ্য করার মতো বিষয় হচ্ছে যে লাদাখের গ্রামগুলোতে স্থানীয় কুকুরগুলো ferral (শিকারী) হয়ে যাচ্ছে। বেশ কিছু সমীক্ষায় এই তথ্য উঠে এসেছে।

কিন্তু এই সমীক্ষা লব্ধ তথ্যের সঠিক মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। ক্লাইমেট চেঞ্জের জন্য কুকুর ferral হয়ে যাচ্ছে বলা অতি সরলীকরণ। গ্রামের কুকুরগুলো para domestic breed। মানে তারা গ্রামের রাস্তায় থাকে আর মানুষের দেওয়া খাবার খায়। Instinct রক্ষা করার জন্য কখনও শিকার হয়তো করতো কিন্তু মূলত মানুষের দেওয়া খাবারের ওপর এরা নির্ভরশীল।

গত ১০ - ২০ বছরে লাদাখ (এবং হিমাচল প্রদেশের স্পিতি ভ্যালি) এর মানুষ খাদ্যাভ্যাস পাল্টাচ্ছে। এই অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্ম যাজকদের প্রভাবে মানুষ নিরামিষ খাবার খাচ্ছে। ভারতীয় উপমহাদেশে অন্যান্য জায়গায় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে নিরামিষ খাবার প্রচলন নেই। উল্লেখ্য যে বৌদ্ধ নেপালি বা লেপচাদের মধ্যে নিরামিষ খাবার বিশেষ প্রচলন নেই। আবার চিন বা দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বৌদ্ধরাও কেউ নিরামিষাশী নয়। উত্তর ভারতে কিন্তু বৌদ্ধদের মধ্যে ক্রমশ আমিষ খাবার বর্জন করা এবং আমিষ খাবারকে ঘৃণা করার প্রবণতা বাড়ছে।

লাদাখ এবং স্পিতিতে মানুষের খাদ্যাভ্যাস পাল্টে যাওয়ায় গ্রামের কুকুরদের খাদ্যাভাব শুরু হয়েছে। জীবন ধারণের জন্য এরা গ্রামের ছাগল, গাধা বা বাছুর শিকার করে খাচ্ছে। সব গ্রামের সব কুকুর বেড়াল ferral হয়ে গেছে। বেড়াল খাচ্ছে ইঁদুর বা পাখি। লামায়ুরুতে আমরা এরকম কয়েকটি বেড়াল দেখি। ২০১৭ সালে আমরা স্পিতিতে দেখেছি ভোরবেলা কুকুররা মিলে গাধা মেরে খাচ্ছে। পরিবেশবিদরা একেবারেই এর সঠিক মূল্যায়ন করছে না। ২০১৫ থেকে ২০২৫ এই অঞ্চলে ঘুরে আমাদের এরকম প্রচুর অভিজ্ঞতা হয়েছে। গ্রামের মানুষদের প্রশ্ন করে জেনেছি যে তারা কুকুর বেড়ালদের কিছুই খেতে দেয় না। কারণ অধিকাংশ সময়ে তাদের বাড়িতে এইসব প্রাণীকে দেওয়ার মতো কোন খাদ্যই থাকে না। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য লাদাখ এবং স্পিতিতে বন্যপ্রাণী ও অন্যান্য জীবজন্তু সমীক্ষার কাজে বহু দেশী, বিদেশী এবং আন্ত রাষ্ট্রীয় NGO অত্যন্ত সক্রিয়। এসংক্রান্ত বিষয়ে নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকার অনেকটাই NGO দের সংগৃহীত তথ্য ও পরামর্শের ওপর নির্ভরশীল। লাদাখ এবং স্পিতিতে ঘোরার সময় গত দশ বছরে বহু NGO কর্মী আমাদের সহযাত্রী হয়েছেন যারা এইসব অঞ্চলে বন্যপ্রাণ ও পরিবেশের নানান সমীক্ষা করেন। 

মানুষ

৩৭০ ধারা বিলোপের পর কেন্দ্র সরকার লাদাখের জনগণের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। লাদাখ পৃথক রাজ্য ঘোষণা করা বা সংবিধানের ষষ্ঠ অনুশাসনের প্রতিশ্রুতি - কোনটাই কেন্দ্র সরকার রাখে নি। এদিকে লাদাখে একের পর এক কর্পোরেট-বন্ধু প্রজেক্ট চালু হয়ে যাচ্ছে। এদিকে নতুন এইসব প্রজেক্টে চাকরির ক্ষেত্রেও এখন আর লাদাখিদের অগ্রাধিকার গণ্য হচ্ছে না। আমরা আগেই আলোচনা করেছি কিভাবে লাদাখের সব থেকে প্রান্তিক যাযাবর গোষ্ঠীর জমি পরিবেশ-বন্ধু সবুজ শক্তি পার্ক নির্মাণ করার জন্য দেওয়া হয়েছে। আমরা যে সময় লাদাখে যাই তখন কারফিউ করে আর সোনাম ওয়াংচুক সহ লাদাখি নেতৃত্ব ও আন্দোলনকারী মানুষকে ধরপাকড় করে পুলিশ প্রশাসন এক ভয়ের পরিমন্ডল তৈরি করে রেখেছিল। (চিত্র ১০) 

ladakh image 10

মিলিটারি আর পর্যটনের সুবিধার জন্য লাদাখ জুড়ে প্রচুর নতুন রাস্তা তৈরি হচ্ছে। নতুন বাড়িঘর তৈরি হচ্ছে অসংখ্য। সেই সব নির্মাণ কাজে অনেক দিন ধরেই পরিযায়ী শ্রমিকেরা কাজ করে। ২০১৫ সালে আমরা লাদাখে মূলত বিহারের পরিযায়ী নির্মাণ শ্রমিক দেখেছিলাম। ২০২৫ সালে দেখলাম পরিযায়ী নির্মাণ শ্রমিকদের মধ্যে প্রচুর মুর্শিদাবাদের বাঙালি। তাদের অনেকের সঙ্গে কথা বলে আমরা জেনেছি কেবল নুব্রা উপত্যকায় এখন গ্রীষ্মকালে প্রায় পাঁচশো জন মুর্শিদাবাদের শ্রমিক কাজ করে। এদের প্রাত্যহিক মজুরি চারশো থেকে সাতশো টাকা। খাওয়া ও থাকার জন্য কিছু টাকা কেটে এক সঙ্গে তিন থেকে ছয় মাসের মাইনে দেওয়া হয় বাড়ি যাবার সময়। সেই টাকাও অনেক সময় নানান অছিলায় কম দেওয়া হয়। এদের অনেকের কাছে উপযুক্ত গরম পোশাক নেই। শুধু কাজের দিনগুলোতে জ্যাকেট দেওয়া হয়। আমরা যখন লেহ থেকে নুব্রা, হানলে বা লামায়ুরু যাচ্ছিলাম অনেক বাঙালি নির্মাণ শ্রমিক বাসে বা শেয়ারের গাড়িতে আমাদের সহযাত্রী ছিল। তাদের অনেকের কাছে যথেষ্ট গরম জামা বা পথে খাওয়া দাওয়া করার টাকা ছিল না। বিশেষত কারফিউ থাকার জন্য গাড়ি ও হোটেলের সমস্যা ছিল। তাই চলাফেরা ও খাওয়া দাওয়া করতে সাধারন খেটে খাওয়া মানুষের প্রচুর হয়রানি হচ্ছিল। কারফিউ এর দিনগুলোতে দামি খাবার দোকান অল্প সংখ্যায় খোলা থাকছিল। কিন্তু রাস্তার ধারের বা স্বল্প দামের খাবার দোকান খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হচ্ছিল।

আমরা ফিরে যাই আর একবার সেই প্রথম প্রশ্নে, কিছু মিল কি খুঁজে পাচ্ছি আমরা? ভুপ্রকৃতিক বা সামাজিক পার্থক্য যাই থাকুক না কেন, মিল বোধ হয় একটাই - উন্নয়নের আখ্যা দিয়ে যে পরিবর্তন আসছে, তাতে পুঁজির গ্রাসে বিলীন হচ্ছে প্রকৃতি, জীবন, জীবিকা, ধ্বংস হচ্ছে জনস্বাস্থ্য। যে পরিবর্তন লাদাখের কুকুরকে তার আদিম বন্য প্রবৃত্তিতে ফেরত নিয়ে যাচ্ছে, তা আমাদেরও পিছিয়ে দেবে না তো হাজার হাজার বছর?

[প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেছেন সাথী পৌলমী, গৌরব ও বিশ্বনাথ।

জনস্বাস্থ্য জনবার্তা বইমেলা ২০২৬ সংখ্যায় আংশিকভাবে পূর্ব প্রকাশিত।]