শিল্পী : অ্যান মের্গেন (১৯৫৪)

আজ সারা পৃথিবীর দিকে তাকালেই দেখতে পারছি, অধিকাংশ দেশেই, বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে সরকার জনগণের প্রতি তাদের দায় দায়িত্ব অস্বীকার করে, সম্পূর্ণ জনবিরোধী এক ব্যবস্থা কায়েম করেছে। বিশেষ করে জনস্বাস্থ্য ক্ষেত্রে চরম অবহেলা, সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর সেবাদাসবৃত্তিতে নিজের নিজের দেশের জনগণের স্বার্থ বিসর্জন দিয়েছে। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে দেশি বিদেশি কোম্পানিগুলোর শাসন রীতিমত জাঁকিয়ে বসেছে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান,শিক্ষা, কর্মসংস্থান সহ সামগ্রিক স্বাস্থ্যকর পরিবেশের ক্ষেত্রে ছোট বড় মাঝারি মাপের নানা কর্পোরেট কোম্পানির অঙ্গুলি হেলনে নির্ধারিত হচ্ছে জনস্বাস্থ্য নীতি। মুক্তবাণিজ্য, বিশ্বায়নের নামে অবাধে প্রকৃতিকে ধ্বংস করে উন্নয়ন বা পাহাড়প্রমাণ মুনাফার একচেটিয়া দখলদারির নেশায় বৃহৎ কর্পোরেট শাসিত তথাকথিত উন্নত দেশগুলোর মধ্যে এক বেপরোয়া প্রতিযোগিতা জনস্বাস্থ্যের মূল ভিত্তিকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। তারা দেশে দেশে যুদ্ধ ও যুদ্ধাস্ত্র রপ্তানি, শিল্পজাত বর্জ্য রপ্তানি, গণহত্যা, গণ উচ্ছেদের মত প্রকল্প চাপিয়ে দিয়েছে। এমনকি সবুজ শক্তির উৎস সন্ধানেই হোক বা খাদ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার নামেই হোক, তারা আসলে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকেই বিপর্যস্ত করে তুলেছে!!

অথচ তাদেরই প্রতিশ্রুতি মতোই এমনটা হওয়ার কথা ছিলো না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তাদেরই কথা মতো 'লীগ অফ নেশনস' গঠিত হয়েছিল। কিন্তু, বিশ্বশান্তি তো দুরস্থান, বরং আরো একটা বিশ্বযুদ্ধ ঠেকানো যায়নি। যুদ্ধের প্রেক্ষাপট যাই হোক, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বিশ্বশান্তি, বিশ্বজুড়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সহযোগিতার অবস্থাও বিপর্যস্ত হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ লগ্নে বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা, মানবাধিকার উন্নয়ন, মানবিক সহায়তা প্রদান এবং আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগের লক্ষ্যে ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল জাতিসঙ্ঘ বা ইউনাইটেড নেশন এবং ১৯৪৬ সালে তার সাধারণ পরিষদ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয় United Nations International Children's Emergency Fund(UNICEF),যাদের ঘোষিত কার্যধারা ছিল বিশ্বজুড়ে শিশুদের জীবন রক্ষা, অধিকার রক্ষা এবং তাদের পরিপূর্ণ বিকাশের সম্ভাবনা পূরণ করার লক্ষ্যে কাজ করা‌। বলা যায় এই সংস্থা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শিশুদের নানা রকম জরুরি সাহায্য প্রদানের জন্যই গঠিত হয়েছিল। যদিও পরবর্তীতে তাদের কার্যধারা স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি, নিরাপত্তা, এবং নিরাপদ পানীয় জল ও পয়ঃনিষ্কাশনের মতো ক্ষেত্রে প্রসারিত হয়। UNICEF এর বর্তমান ধারার কাজে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ১৯৪৮ সালের ৭ এপ্রিল জাতিসংঘের অধীনে গড়ে ওঠা একটি বিশেষ সংস্থা 'বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা' বা World Health Organization (WHO)। প্রতিশ্রুতি মতো এই সংস্থা আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করার কথা। গঠনের শুরু থেকেই যার প্রধান লক্ষ্য হওয়ার কথা বিশ্বের সকল মানুষের জন্য সর্বোত্তম স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা। মহামারী নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্য মান নির্ধারণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান এবং জনস্বাস্থ্য বিষয়ে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা প্রচারের কাজ করার প্রতি এই সংস্থা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলো। বিশ্বব্যাপী রোগের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন করা, তথা সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্য সুরক্ষা এই সংস্থার ঘোষিত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বলে এতো দিন আমরা জেনে এসেছি। এমন কি ওষুধ এবং জৈবিক পণ্যের জন্য আন্তর্জাতিক মান প্রতিষ্ঠা করা।

রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা বিষয়ে গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রদান করা তথা জনস্বাস্থ্যের মান উন্নয়ন করা। বিশেষ করে, উন্নয়নশীল দেশ এবং জনস্বাস্থ্যের সুবিধা থেকে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য পরিষেবা নিশ্চিত করাই ছিলো এই সংস্থার প্রতিশ্রুতি। আমরা জেনেছি "স্বাস্থ্য বলতে কেবল রোগ বা দুর্বলতার অনুপস্থিতি নয়, বরং সম্পূর্ণ শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক সুস্থতার একটি অবস্থা" এটাই ছিলো এই সংস্থার মূল সংজ্ঞা।

"বিশ্বজুড়ে শিশুদের জীবন রক্ষা, অধিকার রক্ষা এবং তাদের পরিপূর্ণ বিকাশের সম্ভাবনা পূরণ করা.." যতই একটি আদর্শ ঘোষণা হোক না কেনো,এর সাথে জড়িয়ে আছে অনেক প্রশ্ন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হ'ল শিশুর 'পরিপূর্ণ বিকাশ' কোন অবস্থায় সম্ভব? শিশুর স্বাস্থ্য,পুষ্টি, 'পরিপূর্ণ বিকাশ' এর উপযুক্ত পরিবেশ কেমন হবে? শিশুর 'পরিপূর্ণ বিকাশ' এর সাথে মায়ের স্বাস্থ্য সহ গোটা পরিবার তথা পরিবেশের স্বাস্থ্যের সম্পর্ক কী? এই নিয়ে আলোচনা শুরু থেকে আজ পর্যন্ত বদলে যাওয়া বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির বিচার বিশ্লেষণ ছাড়া কি আদৌ সম্ভব? একটা সময় ছিলোযখন, যতটুকুই হোক, সামগ্রিক স্বাস্থ্যকে ঘিরে চিন্তার একটা মানবিক মুখ ছিলো। পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় স্বাস্থ্য, এমনকি জনস্বাস্থ্যও হয়েছে পণ্য। নয়া মডেলের উন্নয়নের মুখ হয়ে উঠেছে গণহত্যা, উচ্ছেদ, পরিবেশকে বিপর্যস্ত করে তোলা। এই পরিবর্তিত পরিবেশের অন্যতম প্রধান শিকার হয়েছে মা ও শিশু। অপুষ্টি,অস্বাস্থ্যের প্রধান শিকার তারাই। দুষিত পানীয় জল, বিষাক্ত বাতাস, বিপর্যস্ত নিকাশি ব্যবস্থা,চরম আর্থিক বৈষম্যে,শিক্ষা ক্ষেত্রে বঞ্চনার এই ব্যবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী,বিশেষত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে,বেঁচে থাকাই যেখানে প্রশ্নের মুখে,সেখানে স্বাস্থ্য,বিশেষ করে শিশু স্বাস্থ্যের 'পরিপূর্ণ বিকাশ' কী করে সম্ভব?

এই ধারাবাহিকতায় আমরা দেখেছি শুরুর দিক থেকেই জাতিসংঘ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ সহ সংশ্লিষ্ট নানা সংগঠনই এই পরিবর্তিত ব্যবস্থার তৈরি সমস্যাগুলোর বিরুদ্ধে কোনোও ইতিবাচক স্বর তুলে ধরে না। উল্টে বৃহৎ কর্পোরেট পুঁজিনির্ভর স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং সামগ্রিক সাস্থ্যের এই বিপর্যয়ের ক্ষতের ওপর তথাকথিত সেবামূলক প্রলেপ লাগাতেই ব্যস্ত। স্বাস্থ্যই হোক বা জনগণের শরীর ও মনের 'পরিপূর্ণ বিকাশ'ই হোক, পরিষেবার আড়ালে এদের কাছে সাম্রাজ্যবাদী,ফ্যাসিস্ট দেশসমুহের কর্পোরেট হাঙ্গরদের স্বাস্থ্য বাণিজ্যের কর্মসূচি রূপায়ণই মূল কথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাই হোক আর ইউনিসেফই হোক,এদের কাজ আদতে বিশ্বজোড়া সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় পুষ্ট আন্তর্জাতিক এন জি ও'র মত। এদের কাজ মূলত জনস্বাস্থ্য সম্বন্ধীয় পরামর্শ দেওয়া,কোনো দেশের সার্বভৌম স্বাস্থ্যনীতি নির্ধারণ নয়। বরজোর গৃহীত স্বাস্থ্যনীতির সাথে সহযোগিতা করতে পারে।অথচ,দেখা যাচ্ছে এদেরকেই সর্বময় কর্তা সাজিয়ে বিভিন্ন দেশের সরকারগুলো জনগণের প্রতি নিজেদের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য উপেক্ষা করে দেশের সার্বভৌমত্ব পর্যন্ত বন্ধক রাখছে। কোভিড কালে আরো একবার এই ভয়াবহ চিত্র আমাদের সামনে এসেছে। সংক্রামিত ব্যক্তিকে আইসোলেট করার বদলে গোটা সমাজে একে অপরকে বিচ্ছিন্ন করে,লক ডাউন, মানুষের ওপর দমন পীড়ন সহ, সমস্ত রকমের সমাজবিরোধী মানবতাবিরোধী কার্যকলাপ চালিয়ে যাওয়া হয়েছে।সংক্রমণ ছাড়াও নানা ধরণের গুরুতর রোগ চিকাৎসায় সংক্রমণের ভয় দেখিয়ে মানুষকে নির্মমভাবে বঞ্চিত করেছে। যে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য শিক্ষা নিয়ে ইউনিসেফ ইত্যাদির ঘুম নেই,তাদের চোখের সামনে অপুষ্টি অনাহারে ক্লিষ্ট শিশুকে কোলে নিয়ে রুগ্ন মা যখন নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে মাইলের পর মাইল হাঁটছিলেন,তখন এই অমানবিকতার বিরুদ্ধে এদের ভূমিকা কী ছিলো আমরা দেখেছি। হ্যাঁ,এরা ত্রাণের কথা বলেছে। ত্রাণ চিকিৎসার কথা বলেছে। যেমন সব কর্পোরেট ফাণ্ডেড এন জি ও গুলোই বলে। WHO বা UNICEF বা অন্য সব ধরণের এন জি ও গুলো স্বাস্থ্য শিক্ষা বিষয়ে বিশ্বচুক্তির বা একবগ্গা উদ্ভট নীতি রূপায়ণের নামে সমস্ত পরিষেবা বাণিজ্যিকিকরণের মধ্যে দিয়ে লুট আর পীড়নমূলক একবিশ্ব ব্যবস্থা কায়েমে তৎপর শক্তিগুলোর সাথে গাঁটছড়া বাধতে দ্বিধা করেনি, করেও না।

চলতি ব্যবস্থায় শিশু শিক্ষা সহ সার্বজনীন সুলভ শিক্ষা বিপর্যয়, বেকারত্ব, উন্নয়নের নামে গণ উচ্ছেদের জন্য দায়ী যে শক্তিগুলো, তাদেরই পৃষ্ঠপোষকতায় পুষ্টি লাভ করার মত অনৈতিকতা যে একপ্রকার দুর্নীতিই,সে বিষয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয়? তাদের পৃষ্ঠপোষক শক্তিগুলোই যে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে,তাদেরই স্বার্থে যে শ্রম আইন,স্বাস্থ্যবিধি(গ্লোবাল প্যানডেমিক ট্রিটি ইত্যাদি) সহ সমস্ত রকমের অসাম্য দিন দিন বেড়েই চলেছে,তার ফলেই যে অনাহার অপুষ্টি অশিক্ষা কুশিক্ষার মত জনস্বাস্থ্য বিরোধী আন্তর্জাতিক সমস্যা বেড়ে চলেছে,তার বিরুদ্ধে এই সব এন জি ও গুলোর অবস্থান কী? এ কি,"তোমরা বিষধর সাপ হয়ে কাটো,আমরা ওঝা হয়ে না হয় ঝাড়ফুঁক করে দেবো" সেই চিরাচরিত নীতি নয়? তাই,কাগজে কলমে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য,জনস্বাস্থ্য ইত্যাদির যে সংজ্ঞাই থাকুক,কার্যত স্বাস্থ্য মানে হয়ে দাঁড়িয়েছে কর্পোরেট নিদানের রূপায়ণ, স্বাস্থ্যবিধির নামে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর দমন করা,একটি দেশের সার্বভৌমত্ব ধ্বংস করা আর সর্বরোগহর 'টিকা' দান!!এশিয়া আফ্রিকা জুড়ে দারিদ্রক্লিষ্ট দেশের মানুগুলোকে অবৈধভাবে এরা হরেক রকম টিকা আর ওষুধ পরীক্ষাগারের গিনিপিগে পরিণত করেছে!! পুষ্টিকর সুষম খাদ্য,বিষ মুক্ত পানীয় জল, দুষণ মুক্ত বাতাস,বৈজ্ঞানিক শিক্ষার মত জনস্বাস্থ্য সম্বন্ধীয় অত্যাবশ্যক বিষয়গুলো গৌন হয়ে পড়েছে।অথচ ঐ সমস্ত উপকরণগুলো থেকে কোটি কোটি মা ও শিশুকে, সর্বোপরি জনগণকে বঞ্চিত করছে যারা,সেই সমস্ত শক্তির বিরুদ্ধে এদের সক্রিয়তা কতটুকু? সামগ্রিক স্বাস্থ্যের যে যে মানদণ্ডগুলো স্বীকৃত, তা কোনো দেশের ভৌগলিক অবস্থানের বৈচিত্র,জলবায়ুর বৈচিত্র,খাদ্যের বৈচিত্র, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র ইত্যাদি মেনে কখনোই একই ধাঁচের হতে পারে না। এই বৈচিত্র যেমন দেশে দেশে হয়, তেমনই একই দেশের মধ্যেই এক এক অঞ্চলের ভেতরেই নানা বৈচিত্র থাকতে পারে। তাই কোনো দেশের স্বাস্থ্যনীতি প্রনয়নের ক্ষেত্রে এগুলো অবশ্যই মনে রাখা দরকার। অথচ, বিশ্বজোড়া 'ওয়ান ওয়ার্লড অর্ডার' কেন্দ্রীক সাম্রাজ্যবাদী স্বাস্থ্যনীতির ক্ষেত্রে এসবের কোনো স্বীকৃতি নেই। অথচ প্রতিটি দেশেই জনগণের দ্বারা নির্বাচিত বা অধিকাংশ জনগণের মান্যতাপ্রাপ্ত সরকারের দ্বায়িত্ব হল,সে দেশের জনগণের অন্ন,বস্ত্র, বাসস্থান,শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থানের একটি সুস্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তোলা। জনপ্রতিনিধি হিসেবে এটি তাদের দায়।সরকার জনগণের কষ্টার্জিত অর্থের একাংশ কর হিসেবে সংগ্রহ করে,তা দিয়ে জনগণের সার্বিক উন্নতিতে সততা ও স্বচ্ছতার সাথে কাজে লাগাবে,জনগণের স্বাস্থ্য শিক্ষা সহ সমস্ত মৌলিক অধিকারগুলি সুনিশ্চিত করবে,এটাই কাঙ্খিত নিয়ম নীতি। একান্ত প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতারও প্রয়োজন হতে পারে। এক্ষেত্রেও বলা যায় এই ব্যবস্থা পরোক্ষভাবে জনগণের দ্বারাই পরিচালিত হওয়ার কথা। কিন্তু দেখা যাচ্ছে স্বাস্থ্যের নামে,বিশেষ করে চিকিৎসা তথা স্বাস্থ্য পরিষেবাকে হাতিয়ার করেই ভয়াবহ সংকটে হাঁসফাঁস করতে থাকা পুঁজি আজ সংকট থেকে উদ্ধার পেতে চাইছে!! স্বাস্থ্য পরিষেবার সাথে যেহেতু মানুষের বেঁচে থাকা অথবা মরে যাওয়া জড়িয়ে আছে,তাই এই ধরনের ক্ষেত্রেই বৃদ্ধি পাচ্ছে মুনাফাখোরি ভয় বাণিজ্যের বাজার। আধুনিক চিকিৎসার নামেই হোক বা নানা আজগুবি প্যাথির নামেই হোক,রাস্তা ভিন্ন হলেও লক্ষ্য এক!! স্বাভাবিক ভাবেই এর হাত ধরেই বিমা বাণিজ্যের রমরমা!!

এই রকম একটা আবহে,এরকম একটা ব্যবস্থার সাথে মিথোজীবীত্বেই ইউনিসেফ বা ঐ জাতীয় আন্তর্জাতিক এন জি ও গুলো কাজ করে যায়। কখনো ইমার্জেন্সি অথরাইজশন কখনো বা ম্যানডেটারি ভ্যাকসিনেশনের বা প্রোটোকল ইত্যাদির নামে বিশ্ব স্বাস্থ্য বাণিজ্য সংস্থা তথা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিতর্কিত ওষুধনীতি,টিকাকরণ নীতির প্রয়োগই তো আসল স্বাস্থ্যনীতি!! নিত্য নতুন ঝাঁকে ঝাঁকে টিকা বাজারে চলে আসছে। মা বাবা অপত্য স্নেহে বিনা প্রশ্নে তাদের একমাত্র একরত্তিকে নিয়ে ছুটছেন প্রাইভেট চেম্বারে। কী হচ্ছে তার ফল বা আদৌ কোনো ফল হচ্ছ কি না,কীই বা হচ্ছে তার উপকার,জানা নেই,জানার কোনো আগ্রহও নেই।অথচ পান থেকে চুন খসলেই শিশু আজ এ ঝামেলায় তো কাল ও ঝামেলায় কুপোকাত।

শিশু যতটা না খাবার খায় তার তুলনায় ফুড সাপ্লিমেন্ট খায় বেশি। সমান তালে বেড়ে চলে 'দেখো আমি বাড়ছি মাম্মি' বিজ্ঞাপন। কোনো WHO,কোনো সরকার,কোনো UNICEF সত্যিকারের খাদ্যের তুলনায় মুড়ি মুড়কির মতো ফুড সাপ্লিমেন্টের উপকার কী? এ নিয়ে প্রশ্ন তোলে না! ওগুলো বড়লোকের বা স্বচ্ছল পরিবারের পুষ্টি যোগায় বলে?না কি অন্য

কিছু? অন্য দিকে? অপুষ্টির শিকার শিশু খেতে পায় না,তবু টিকা পায়! বিষাক্ত কাশির সিরাপ খেয়ে শিশু মরে,বিষাক্ত স্যালাইনে মায়ের প্রাণ বিপন্ন,অক্সিজেনের অভাবে শত শত শিশু প্রাণ হারায় ওদিকে অক্সিজেন জোগাতে গিয়ে ডাক্তার জেল খাটে! এই ভাবেই দরিদ্র প্রান্তিক মানুষ একটা ব্যবস্থার ওপরে আস্থা হারাতে হারাতে আরেকটা ব্যবস্থার খপ্পরে পরে!! এইবার 'ওরা' আসে। গ্রাম থেকে প্রত্যন্ত গ্রামান্তরে, শহরতলীর কোনায় কোনায় 'প্রজেক্ট' নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে! জনগণকে টাকা পয়সা অবশ্য খরচ করতে হয় না। সরকারেরও নয়। সব 'ওনারা'ই স্পনসর করেন! কার কাজ কে করে! আমরা শুধু কর আর ভোট দিয়েই যাই! স্বাভাবিক ভাবেই এদের কার্যক্রমকে ঘিরেও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ ও বিতর্ক।ঘোষিত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে নানা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এরা পুঁজিবাদী স্বাস্থ্য পরিষেবারই বীজ বুনে যায়। এরা প্রকৃত অর্থে এই ব্যবস্থার বদল চায় না। তাই,এদের বিরুদ্ধে যুদ্ধবাজ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ,প্রাপ্ত তথ্য কুক্ষিগত করা থেকে পাচার করা সংক্রান্ত অভিযোগও ওঠে। সেই অভিযোগের বিচারে দ্বায়িত্ব বর্তায় অবশ্য এদেরই পৃষ্ঠপোষকদের দ্বারা পরিচালিত বিচার ব্যবস্থার ওপর! যাই হোক, সে অবশ্য ভিন্ন প্রসঙ্গ।

মোদ্দা কথা হল,যে উন্নত জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট যাবতীয় ব্যবস্থা জনগণের করের টাকায়,জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকারের জনপ্রতিনিধিদেরই জনগণের কাছে সুলভে পৌঁছে দেওয়ার কথা,সেটা না করে তা তুলে দেওয়া হয়েছে বৃহৎ কর্পোরেটদের হাতে। জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভয়াবহ সত্য যাতে জনসমক্ষে ফাঁস না হয়ে পড়ে,তার আড়াল হিসেবে জনমোহীনি চিকিৎসা পরিষেবার বিজ্ঞাপন দৈনিক সংবাদ মাধ্যম সহ সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। অধুনা বৃহৎ কর্পোরেট পুঁজির মৃগয়াক্ষেত্র বিশ্ব স্বাস্থ্য বাণিজ্য সংস্থাই হোক,বা ইউনিসেফের 'স্বাস্থ্য সেবা'র মডেলই হোক,সেগুলো যে আসলে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভয়াবহ বিপর্যয়কে আড়াল করার এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হতে হতে প্রান্তিক মানুষের হতাশা ক্ষোভ বিক্ষোভকে দমন করার অন্যতম হাতিয়ার। তা না হলে কেনো এ দেশেই, দেশের জুড়ে চলমান দুর্ভিক্ষের ছবি জনসমক্ষে সরকারের হাতে তুলে ধরার জন্য কারাবাসের শাস্তি পেতে হয় সরকারেরই নিয়োজিত কমিটির বিশিষ্ট চিকিৎসককে?

অতএব,মা ও শিশুর স্বাস্থ্য, শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশে কর্পোরেট অনুদানে পুষ্ট ইউনিসেফ কোনো বিকল্প নয়। জনগণের দেওয়া করের অর্থে সরকারকেই এই দ্বায়িত্ব নিতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য বাণিজ্য সংস্থায় পরিণত হওয়া 'বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা'ই শুধু নয়,দেশের নিজস্ব বাস্তবতার ভিত্তিতে জনগণের,বিশেষ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রান্তিক মানুষের জীবনধারণের মানোন্নয়নের লক্ষ্যে জনস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্য পরিষেবা নীতি তৈরি ও কার্যকর দেশের সরকারকেই করতে হবে। 'এক দেশ এক নীতি' বা এক বিশ্ব এক নীতি'র মত একবগ্গা নীতি নয়,চাই প্রতিটি ব্যক্তি মানুষের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উন্নতির লক্ষ্যে উপযুক্ত নীতি গ্রহণ ও তা কার্যকর করা।

[জনস্বাস্থ্য মোর্চার মুখপত্র 'জনস্বাস্থ্য জনবার্তা' পত্রিকার বইমেলা ২০২৫ সংখ্যায় প্রতিবেদনটি পূর্বপ্রকাশিত। 

লেখক হালিশহর বিজ্ঞান পরিষদ ও জনস্বাস্থ্য মোর্চার সদস্য এবং জনস্বাস্থ্য আন্দোলনের কর্মী]

লেখক সম্পর্কে

GRAPH_AVATAR_IMG
ত্রিদীপ দস্তিদার